মূর্তি !

ফরহাদ হোসেন

উধুমডাঙ্গা বাসস্টান্ডে চিৎকার,চেচামেচি,গাড়ির শব্দ।অতিথি শালায় দাঁড়িয়ে আছে অমিত,প্রিতমের অপেক্ষায়।দুজনেই খুব ভালো বন্ধু।প্রিতম আজ দীর্ঘদিন পর অমিতের বাড়ি আসছে।শেষবার,পাঁচ বছর আগে এসেছিল।তার পর আর আসা হয়নি।

যখনি স্টান্ডে কোন বাস আসে তখনি অমিতের অনুসন্ধানি চোখ প্রিতমকে খুঁজে।কয়েকটা বাস আসলো-গেল।প্রিতম এলো না।এবার নীল রংয়ের একটা বাস আসতে দেখে অমিত বাসের কাছাকাছি গেল।দেখলো ভীড় অতিক্রম করে বাইরে বেড়িয়ে আসছে প্রিতম।অমিতকে কাঁদো কাঁদো অবস্থায় জড়িয়ে ধরলো।প্রিতম খুব সহজ সরল ছেলে।কেউ যদি বলতো-

  “প্রিতম খুব ভালো ছেলে”

সে কেঁদে ফেলতো।খুব ভালো মনের মানুষ হলে যা হয় আর কি।সে সুন্দর ভাবে কথা বলতে পারে।তার রং মেশানো কথা আপনাদের জীবন্ত বলে মনে হবে।

দুজনেই বাড়ি ফিরছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা কথা বলতে বলতে।বাড়িতে এসে খাওয়া দাওয়া সমাপ্ত করে প্রিতম বিশ্রাম নিল।অমিত গেল বাজারে।তাদের কলেজ শেষ হওয়ার ছয় বছর হতে চললো।এখনো পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারেনি দুজনেই।নিজের দায়িত্ব সামলাতেই নাভিশ্বাস!তার উপর আবার পরিবারের দায়িত্ব!ভালো কিছু করবে।

ভালো ভাবে বাঁচবে,এই তাদের আশা।রাতে অমিতের শোয়ার ঘর ভরে গেল পুরোনো দিনের গল্প,হাসি-ঠাট্টায়।শ্মৃতিপটে ভাসতে লাগলো কলেজ জীবনের ফেলে আসা দিন।সে সময়ের কত স্বপ্নের কথা!শেষমেশ ‍অযাচিত ভাবেই এসে হাজির হল দীর্ঘ নিশ্বাস!কিছু না করার যন্ত্রণা!জীবনে এখনো পর্যন্ত তারা লক্ষে পৌছাতে পারেনি!

এমন সময় প্রিতম বলে উঠলো-

      “আজ আসার সময় নেতাজির দেখা হয়েছিল।”

প্রিতমের এটাই দোষ।সিরিয়াস মহূর্তে বারবরেই এমন কিছু করে যে সিরিয়াসনেসটা ভেঙে দেয়।

অমিত হেসে বলল-“কোন নেতাজি?”

প্রিতম-“নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু।”

অমিত- “আবার শুরু করলি।”

প্রিতম- “না রে সত্যি বলছি!”

অমিত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রিতমের দিকে।শোনার জন্য,সে কি বলবে? মুখের ভাবভঙ্গি আগের মত নেই।সত্যি যেন সে নেতাজিকে দেখেছে।

“রক্ত মাংসের বিদ্রোহী পুরুষ নেতাজি নয়!”

আমিত-“তাহলে?”

প্রিতম-“পাথরের মূর্তি!রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।আঙ্গুল নির্দেশ করে আছে সামনের বস্তির দিকে।”

এটাই প্রিমতের স্বভাব।কত রাস্তার মোড়েই তো মূর্তি থাকে!কথাটা এমন ভাবে বলল যে সত্যি যেন সে নেতাজিকে দেখেছে।সামান্য কথা অসামান্য করে উপস্থাপন করায়  তার জুড়ি মেলা ভার।

“জানিস  অমিত!সে সময় আমার মনে হচ্ছিল,কেন নেতাজি বস্তির দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে আছে?অন্য দিকেও তো নির্দেশ করতে পারতো।”

কথাটা অন্য রকম ঠেকলো অমিতের !গভীর আবেগ থেকে কথাটা বলেছে সে।স্বাধীনতার এত বছর পরেও বস্তি বিদ‍্যমান।এই জন্যই আঙ্গুল বস্তির দিকে নির্দেশ করা।আসলে প্রিতমের মত ছেলে অনেক সময় ভুলে যায় দিল্লি চল স্লোগান!তারা আবেগী হয়। অমিত প্রিতমকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে এসব চিন্তা তাদের নয়।যারা ভাবার তারা ভাববে।

মূর্তিমান মানুষেরা দেশকে ভালোবেছেন। দেশের জন‍্য জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন। ত‍্যাগ করেছেন সুখ-সাচ্ছন্দ‌। তার প্রতিদান স্বরূপ রাস্তায় রাস্তায়,মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে মূর্তি।এটা সন্মান প্রদর্শন।এর চেয়ে বেশি কি করার আছে?এটা প্রিতমের পাগলামি!ছোট্ট বিষয়কে ছোট্ট করেই ভাবতে হয়।মূর্তিমান মানুষের সাধের ভারতবর্ষ বেকারত্ব,দরিদ্রতায় ভরে যাক !

নেতাজি গান্ধীজি, নেহেরু, প‍্যটেল, সবাই দেশকে ভালোবেসেছেন।দেশের উন্নতি চেয়েছেন।দরিদ্রতা মুক্ত ভারত গঠন করার স্বপ্ন দেখেছেন। শিক্ষায়, প্রযুক্তিতে দেশের সন্মান গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ুক এই কামনা করেছেন।কিন্তু বাস্তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এই সব বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিলে তাদের বেশি সন্মান দেওয়া হত।কারন তাদের কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।পারি কি না সেটা পরের কথা?তাদের অপূর্ণ স্বপ্ন আমাদের ঘুমোতে দেয়না! এটাই হত স্বর্গীয় আত্মার শান্তনা!

অমিত বলে উঠে-

“আমাদের সবার একি প্রশ্ন?কেন স্বাধীনতার এত বছর পরেও বস্তি থাকবে?”

প্রিতম বলে-

“ফুটপাতে কেন লক্ষ লক্ষ জীবন অসহায় বোধ করবে?আজ যদি মূর্তিমান মানুষেরা বেঁচে থাকতেন।তারা কি দুঃখ পেতেন না?তাদের সাধের ভারতবর্ষে তারা মূর্তির মধ্যেই বিদ‍্যমান! হৃদয়ে নেই! হৃদয়ে থাকলে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করা হত।”

প্রিতমের কথা গুলো সত্যি ভাবার।যদি মূর্তিমান মানুষদের স্বপ্নের ভারতবর্ষ গড়ে তোলা যেত!এটা হত দেশের মানুষের কাছে থেকে পাওয়া তাদের সবচেয়ে বড় উপহার।যোগ্য সন্মান।দেশে বুকে একটা মূর্তি না থাকলেও তারা আমাদের কল্পনার ধ্রুবতারা । হৃদয়ের শাশ্বত স্থানের অধিকারী।

অমিত প্রিতমকে বলে-

“চল খাওয়া দাওয়া সেরে নিই।অনেক রাত হল।এ সব বিষয় ভাবিস না পাগল হয়ে যাবি।”

খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লো তারা।

কয়েক দিন অমিতের বাড়িতে থাকার পর আজ বাড়ি ফিরছে প্রিতম।অমিত তাকে বাসস্টান্ডে পৌচ্ছে দিল।গাড়ির সিটে বসিয়ে দিয়ে বিদায় জানাল।গাড়ি চলতে শুরু করলো।একটার পর একটা গাছ-পালা,মাঠ অতিক্রম করে চলল গাড়ি।মাঝে মাঝে অতিক্রম করল একটা দুটো মূর্তি।

প্রিতম যেন কোথায় হারিয়ে যায় মূর্তি দেখে।মেনে নিতে পারেনা মূর্তিমান মানুষদের আশা-আকাংখা অপূর্ণ থাকা।মূর্তি বানিয়ে সন্মান দেখানোটা মেকি মনে হয় তার কাছে।

মূর্তিমানদের কল্পনার ভারতবর্ষ কি কল্পনায় থেকে যাবে?এই সব চিন্তা এমন ভাবে চেপে বসলো প্রিতমের যে তা থেকে বের হতে পারলো না।কোন কিছুতেই মন বসাতে পারলো না।দু-এক বার মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে দেখানো হয়েছে।কোন লাভ হয়নি।

ধীরে ধীরে মানসিক সমস্যা বাড়তেই থাকে।কয়েক বছর পর আশে পাশের মানুষদের কাছে আর্ধ-পাগল বলে আক্ষায়িত হল । বিয়ে করা হয়নি ! সংসার করা স্বপন স্বপ্নই থেকে গেল প্রিতমের!তার বাবা কোন ক্রমে সংসার চালান।মূর্তির কথা ভাবতে ভাবতে সে আজ একটা পরিবারের জীবন্ত মূর্তি!অমিত এখন একটা কারখানার নাইট গার্ডের কাজ করে। সুখে আছে  কিনা মুখ দেখে বোঝা যায় না ? বুক চিঁড়লে হয়তো উত্তরটা পাওয়া যেত!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: