লাল ফিতে

pal

 প্রিয়নীল পাল

.
রিজু রোজ স্কুল যেতো সুভাষ পল্লী হয়ে ঘুরে, এমনিতে সোজা রাস্তা আছে কিন্তু সে ঘুরে যেতো, এই সুভাষ পল্লী হয়ে যাওয়ার রাস্তায় একটা গার্লস হাইস্কুল পড়তো, সেখানে রুমা রোজ 10.45 করে স্কুলের মেন গেট এর বা দিকে একটা বট গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতো আর পাশে দিয়ে রিজু সাইকেল এ বেল মেরে মেরে চলে যেতো।
তার পর রুমা হেসে স্কুল ঢুকে যেতো।
শনিবার রিজু বাড়ি ফেরার সময়ে বট গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে রুমা এসে বলছে ‘কি রে আজ তাড়াতাড়ি চলে এলি’!
রিজু বলে ‘হ্যাঁ আজ বেরিয়ে এসেছি তাড়াতাড়ি’, রিজু এক জোড়া লাল ফিতে বের করে রুমার হাতে ধরিয়ে দেই, বলে এটা রাখ, ‘আজ আসার সময়ে দেখলাম তোর চুলে বাধা ফিতেটা কেমন ফেকাসে হয়ে গিয়েছে এটা চুলে লাগাস ভালো লাগবে তোকে।
রুমা হেসে হেসে বলে ওঠে তুই একটু সময়ে কত কিছু লক্ষ করিস রে!
রিজু সেদিন বাড়ি আসতে আসতে মনে মনে ভেবেছিল এই ফিতের মতোন সারাটা জীবন রুমা তাকে তার সাথে বেঁধে রাখবে আর সেই খুশিতেই মত্ত ছিল রিজু।
রিজু এই কথাটা রুমাকে সোমবার বলবে ভেবে রেখেছে।
রুমা ক্লাস নাইন এ পরে আর রিজু টেন, ওদের নতুন প্রেম লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা, একটু মুচকি হেসে সম্মতি দেওয়া, একটুখানি কাগজের টুকরো হাতে নিয়ে দু লাইন চলতি বাংলা প্রেম এর কথা লেখা।
চকোলেট, পেয়ারা, গাছের লেবু এই সব উপহার দেওয়া, বেশ নির্ভেজাল খাদ ছাড়া ভালোবাসা।টাকার অঙ্ক কিংবা স্ট্যাটাস আপডেট কিছুই এই ভালোবাসা কে ছুয়ে দেখতে সাহস করে না। বাড়ির পাশের রমেশ কিংবা টিউশন ব্যাচ এ পড়া কাজল রুমার দিকে তাকালে সোজা গিয়ে একসেন, ‘ও আমার ওর দিকে তাকাবি না’
সেই দেখে রুমার অবাধ স্বপ্নে বিচরণ। রিজুকে ‘চ্যালেঞ্জ’ সিনেমার দেব ভেবে প্রেম পুরো মাখো মাখো।
রুমার মামার বাড়ি দূরে বলে তাকে পড়ার অজুহাত করে করে বারে বারে যেতে না দেওয়া আর রুমা কে নতুন নতুন গানের লাইন শুনিয়ে নিজেকে সেরা প্রেমিক প্রমাণ করার চেষ্টা চলতো অনবরত।
এদিকে রুমা মাঝে মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের হাতে তৈরী ম্যেগি কিংবা পুড়ে যাওয়া রুটি আলু-ভাজা টিফিন করে ভোরে ভোরে রিজুকে মাঝে মধ্যে দিত, সেটাই বিশেষ তৃপ্তি করে রিজু খেত আর বলতো বিয়ের পরেও এরকম করে খাওয়াবি বেশ। আর রুমা মুচকি হেসে এরকম পোড়াই খেতে হবে কিন্তু! তাতে কি এ যে স্বার্থহীন ভালোবাসা।
রুমার টিউশন শেষ হলেই বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে রিজু গুণ গুন করতো আর হেসে হেসে রুমা পেরিয়ে যেতো, তাতেই কুপকাত রিজু। আড্ডা মারতে মারতে বন্ধুদের কাছে নিজের সুখের সংসার তৈরি করার স্বপ্ন ভাগ করে নেওয়া চলতো ক্রমাগত। কত খুশির দিন সব যেনো রঙিন।
সোমবার থেকে রুমা আর স্কুল আসে নি, রিজু অনেক খোঁজ খবর নিয়েছিল শুনেছিল তারা নাকি বেঙ্গালোর চলে গিয়েছে।
তারপরে কেটে গিয়েছে দশ বছর।
রুমা এখন কলকাতার একটা নামী কোম্পানিতে কর্মরত।আজ হঠাৎ পুরোনো আলমারি খুলে পরিস্কার করতে গিয়ে এই ফিতে জোড়া দেখতে পায়। হাতে নিয়ে কিছু সময় তাকিয়ে থাকে তারপরে রেখে দিয়ে বন্ধ করে দেয় আলমারি।
এরকম করেই হাজার স্মৃতি ইতিহাস হয়ে জীবন পাতা জুড়ে থেকে যায়, আর আমরা স্বপ্ন দেখি পূরণ হওয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *