বিচ্ছেদ  // ফরহাদ হোসেন

 

 

SAHITYA

আকাশ-আর মেঘের প্রেমের সম্পর্ক।আকাশের জীবনে আগেও বহুবার  প্রেম এসেছিল।কিন্তু কোনবারেই সম্পর্ক পরিনতি পায়নি!প্রতিবারেই দুঃখ ভুলে,আবার নূতন নূতন মেঘেদের সঙ্গে প্রেমেলীলায় মেতে উঠেছে।আকাশকে যদি প্রশ্ন করা হয় এত প্রেম আসে কোথা থেকে?আকাশ হয়তো বলবে-‘আমি ভালোবাসতে জানি।কাছে টানতে পারি।কেউ যদি আমাকে ছেড়ে চলে তাহলে কেন আমি মন খারাপ করে বসে থাকবো?নূতন ভাবে কি জীবন শুরু করবো না?’

কি কপাল আকাশের এবার ও বিচ্ছেদ! বৃষ্টির রাত;মেঘের বিয়ের বাজনা বাজছে।মহা সমারোহে বিদাই হল মেঘের।আকাশের কিছু করার নেই।মেঘকে যত্ন করে আগলে রাখতে পারে আকাশ কিন্তু বেধে রাখতে কি পারে?যে যাবার সে যাবে।এর পরেও আকাশ আবার  প্রেমে পরবে।উদার বুক পেতে রাখবে নূতন মেঘেদের জন্য…..।

রহিমকে সবাই আকাশ বলে ডাকে।এটাই তার ডাক নাম।বাবা,মা নিয়ে সুখের সংসার।এছাড়াও আছে একজন।যার নাম আকাশ ভালোবেসে দিয়েছে মেঘ।আসল নাম নুরি।দুই বছরের সম্পর্ক।রহিমের প্রেমের বিষয়ে বাবা মায়ের মধ্যে মা জানে;বাবা জানে না আর জানলেও মেনে নেবে না।মা প্রথম যেদিন শুনেছিল নুরির কথা,খুশি হয়ে বলেছিল-

-‘মেয়েটা দেখতে কেমন রে বাবা।আমাদের সাথে মিলেমিশে থাকলেই হল।’

মায়ের কোন আপত্তি নেই।বাবা অনুপস্থিতিতে মা  নুরিকে অনেক বার বাড়ি আনতে বলেছে কিন্তু রহিম সাহস করে নিয়ে আসতে পারেনি,যদি হঠাৎ বাবা চলে আসে।এমনিতেও নুরি আর রহিমের দেখা খুব একটা হয় না-সপ্তাহে একবার;কখনো বা মাসে দুবার।কথা যা হয় ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা।আধুনিক যন্ত্র দূরত্ব কমিয়েছে দুই প্রেমিক যুগলের।

আজ,নুরি শহরে এসেছে পূজোর কেনাকাটা করতে।রহিমও আসে।….নুরিকে অন‍্যমনস্ক দেখে রহিম জিঙ্গেস করে-‘কি হয়েছে?কোন সমস্যা?’নুরি বলে-‘না না কিছু না।’রহিম লুকোতে দিল না নুরির অন‍্যমনস্কতার কারন।জোর করায় সব খুলে বলল।বাড়িতে বিয়ে দেওয়ার জন্য ছেলে খুঁজতেছে নুরির।

কিছু করতে বলে রহিমকে।কি করবে রহিম ভেবে পায়না?দীর্ঘক্ষন কথা বলার পর রহিম আশ্বস্ত করে কিছু একটা করবে।নুরি বুকে সাহস,মুখে একটু হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে।রাতে রহিম মাকে সব খুলে বলে।ছেলের চিন্তায় মাও অস্থির হয়ে ওঠে।রহিমের বাবাকে গিয়ে সব জানায়।বাবা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে-

‘প্রেম-ভালোবাস আমি বুঝিনা।আমি যেখানে বিয়ে দেব সেখানে বিয়ে করতে হবে।না হলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে পারে।’

মা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করে আগের মত ভাবলে চলে না।এখন সবাই নিজের পছন্দেই বিয়ে করে।রহিমের বাবা যতই রাগি হোক,রহিমের মায়ের কথা কোন দিন ফেলে না।তাদের দাম্পত্য জীবন সবার অনুকরণ যোগ্য।গ্রামে সবাই নামাও করে।

-‘মেয়ের নাম কি?’

-‘নুরি’

-বাহ!বেশ সুন্দর নামটা।

রহিমের মা মুচকি মুচকি হাসে।

-‘এতো খুশি হওয়ার কিছু নেই।আমি এতটাও খারাপ না যে ছেলের সুখ দুঃখ বুঝবো না?’

রহিমের মা এবার জানায়,ছেলে যদি নুরির বাড়িতে না জানিয়ে নুরিকে নিয়ে আসে তাহলে কোন আপত্তি আছে নাকি?রহিমের বাবা অবাক হয়ে কারণ জানতে চায়।

-‘নুরি আসলে হিন্দু পরিবারের মেয়ে।পুরো নাম নির্মলা দাস।’

বাবা প্রচণ্ড রেগে যায়।ভেবে পায় না কি বলবে?রহিমের মাকে বোঝানোর চেষ্টা করে এই সম্পর্কের পরিনতি অসম্ভব।সমাজে মুখ দেখানো যাবে না।হিন্দু ঘরের মেয়ে মুসলমানের ঘরে আসবে কি করে?নুরির বাবা মা,তার সমাজ ছেড়ে কথা বলবে না।বড় কোন বিবাদের সৃষ্টি হবে এতে।

আলিপুরদুয়ার থেকে ছেলে দেখতে আসে নুরিকে।তাদের পছন্দ হয়।ছেলে খুব ভালো।সরকারি চাকরি করে।কিন্তু নুরি বিয়েতে রাজি হয় না।সাহস করে বৌদিকে জানায় রহিমের বিষয়ে।বৌদি কাছ থেকে ধীরে ধীরে সবাই জানতে পারে।নুরির উপর চলে অনেক ঝড় ঝাপ্টা।নুরির বাবা নুরির চোখের জল দেখতে পারে না।

মানুষটা অনেক উদার।যদি সে মেয়েকে রহিমের হাতে তুলে দিতে পারতো তাহলে বোধহয় খুশিই হত।কিন্তু সমাজের ভয়!নুরির দাদার একরোখা মনভাবের জন্য আলিপুরদুয়ারের ছেলের সাথেই নুরির বিয়ে ঠিক হল।নুরির বাইরে বেড়নো বন্ধ।কোনক্রমে লুকিয়ে ফোন করে রহিমকে দেখা করতে বলে।নানা কৌশলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে নুরি।দুজনের দেখা হয়।অন্য দিনের মত আনন্দ নেই।নুরি বলে-

-‘আমি হিন্দু আর তুমি মুসলিম বলেই কি আমাদের সম্পর্ক পরিনতি পাবে না?কি দোষ আমাদের?’

-‘দোষ আমাদের না।চলে আসা নিয়মের সব দোষ।নিয়ম থেকে বাইরে বেড়িয়ে আসতে চাইলেও পারি না,বা বের হতে দেয় না।’

দুজনেই আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পালিয়ে তারা বিয়ে করবে না।পরিবারের সম্মতি পেলে তবেই বিয়ে করবে।আর যদি তা না হয় ছড়িয়ে পরবে বিচ্ছেদ যন্ত্রণা তো পরবে!

নুরির বিয়ে।পাত্রের নামটাও বেশ পরিমল রায়।বিদায়ের আগে নুরির কি কান্না!কিসের জন‍্য এই কান্না?বিয়ের দিন আপনজন ছেড়ে চলে যায় বলে যে কান্না এটা কি সেই কান্না!নাকি প্রেমিক মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার কান্না!নুরির বিদায় হল সকাল সাতটার দিকে।বিয়ের বাদ‍্যযন্ত্র যেমন ভাবে বেজেছিল তেমন ভাবেই হৃদয় ভেঙেছিল রহিমের।সারারাত ঘুমোতে পারেনি।নিঃশব্দে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসেছিল।

আকাশ তার প্রিয়তমা মেঘকে হারিয়েছে কিন্তু তার নীল বুকে জন্ম নিয়েছে আরো নূতন মেঘের ঘনঘটা।শুরু হয়েছে আবার প্রেম।আবার হারাবে,আবার খুঁজে নেবে।কিন্তু রহিমের বুকে জন্ম নেবে কি নূতন প্রেমের ভাষা?এক মাস অতিক্রান্ত।এখনো রহিমের মন ভালো নেই।বাবা,মা অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু মন বোঝেনি।নুরি নূতন সংসার গোছাচ্ছে দুঃখে না সুখে,কে জানে!নুতন মানুষদের সঙ্গে হেসে হেসেই কথা বলে!নুরির মন কে পড়বে?কার সামর্থ্য আছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *