মুয়াদেবের শাপ  // সুব্রত মজুমদার

subrata majumdar2

বাড়ির মেঝে তৈরি হবে, রাজ মিস্ত্রি বলেছে খবরের কাগজ চাই। আমি আবার খবরের কাগজ পড়ি না। আর পড়বই কেন, – যা সব গা ঘিনঘিনে খবর দেয়। অমুক রাস্তার ধারে ধর্ষিত যুবতীর লাশ উদ্ধার। বা রাজনৈতিক সংঘর্ষে মৃত ২৫। এগুলো কি সকাল সকাল কারো ভালো লাগে ?

যাই হোক খবরের কাগজ চাই। চাই তো পাই কোথা ? রাজমিস্ত্রিই বাতলে দিল ঠিকানাটা। বাজার যাবার রাস্তায় যে ভাঙ্গারওয়ালার আড়ৎ সেখানেই গেলাম। পরিমানটা রাজমিস্ত্রি বলেনি। ভাঙ্গারওয়ালাই কেজি দুয়েক মত ওজন করে ব্যাগে ভরে দিল।

বাড়ি ফিরে খবরের কাগজ সঠিক হাতে হস্তান্তর করার পর সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছি আর রাজমিস্ত্রির ডাক।

-দাদা, কাগজের সঙ্গে এইটে কি দেখেন তো।

দেখলাম তার হাতে ভেলভেট পেপারের বাঁধাই একটা ডায়েরি। কৌতুহলের বশে হাতে নিয়ে দেখি ডায়েরিটা নতুন বা আনকোরা নয়। পিছনের কিছু পাতা বাদে গোটা ডায়েরিটাই সুন্দর সুন্দর অক্ষরে পরিপাটি করে লেখা। হতে পারে কারোর দিনলিপি। বা এমনও হতে পারে কেউ অফিস বা ব্যবসার তথ্য নোট করে রেখেছে ডেটওয়াইজ। ডায়েরিটা টেবিলে রেখে নিজের কাজে মন দিলাম। চা- টা শেষ করে বাগানের গাছগুলোকে ছাঁটতে হবে।

                                        দুপুরে খাবার পর ভাতঘুমের অভ্যাস আমার। আজ আর ঘুম এলো না। ডায়েরিটা একবার পড়ে দেখা দরকার। টেবিলের উপর হতে টেনে নিলাম ডায়েরখানা।

মলাট ওল্টাতেই প্রথম পাতার উপর বড় বড় অক্ষরে লেখা

                    বিক্রমাদিত্য মুখোপাধ্যায়

                    পহেলা বৈশাখ

দ্বিতীয় পাতাটি বাদ রেখে তৃতীয় পাতা হতে লেখা শুরু হয়েছে। ডায়েরিতে যেভাবে লেখা আছে তা হুবহু নিচে তুলে ধরছি।

১৫ ই এপ্রিল

      আজ সকালবেলা চা নিয়ে বসেছি এমন সময় গাইতা পালের রাখাল হিজু কাঁদতে কাঁদতে এসে হাজির হল।

-খুব বেপদ দাদাবাবু ! রামুকে রাত হতে খুঁজে পেছি না। আমার রামুকে খুঁজে দেন দাদাবাবু।

হিজু কাঁদতে লাগল। তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে চুপ করালাম। হিজুর মুখে যা ইতিবৃত্ত শুনলাম তা সংক্ষেপে এই –

হিজুর ছেলে রামু প্রতিদিন তার বাবার সাথে গরু চরাতে যায়। কাল দুপুরে জঙ্গলের ভেতর গিয়েছিল বন্ধুদের সাথে। বাপের শত নিষেধেও সে কর্ণপাত করেনি। হিজু বলেছিল -“যাসনা বাপ ! উধারে বনের ভিতর মুয়া দেবতার থান। কেউ ভয়ে যায় না। তু বরং বন্ধুদের সঙ্গে ইখানে গাদালড়ি খেল।”

রামু শোনেনি। সে বাপের অন্যমনস্কতার সূযোগে পালিয়েছে। ওখানে নাকি আমের গাছে অসংখ্য আম।

বন্দুকটা নিয়ে বের হলাম। সাথে হিজু আর আমার কুকুর ডন। জঙ্গলের ভেতর কিছুটা চলার পর আলো কমে আসতে লাগল। অসংখ্য শাল মহুল আর বিড়িপাতার গাছ। মাঝে মাঝে দু-একটা বট পাকুড় আর নিমের গাছ। গাছগুলোর তলা হতে বুনো লতা বের হয়ে গাছকে বেস্টন করে উপরে ছড়িয়ে পড়েছে। কুর্চি ফুলের গন্ধে ম ম করছে চারপাশটা। ঝোঁপের মধ্যে কি একটা সড়-সড় করে বেরিয়ে আসছে দেখে বন্দুকটা উঁচিয়ে ধরলাম।

না ! যা ভেবেছিলাম তা নয়। ওটা একটা মোর পাখি। ছোট, অনেকটাই ময়ূরের মতো দেখতে । তবে এর পেখম নেই। আমি বুনো-শুয়োর ভেবেছিলাম। হিজুর মুখটা ভয় আর উৎকণ্ঠায় শুকিয়ে গেছে। ফ্লাক্স হতে চা বের করে দুজনে গলা ভিজিয়ে নিলাম।

রাত ১ টা

ঘণ্টাখানেক আগে ফিরেছি। রামুকে উদ্ধার করে এনেছি, কিন্তু ওর এক বন্ধুকে বাঁচাতে পারলাম না। দুপুরের কাছাকাছি আমরা বনের অনেকটা গভীরে পৌঁছে গেছি। মধ্যগগনে রবিদেবের অবস্থান সত্ত্বেও ঘন অন্ধকারে ঢেকে গেছে বনতল। সার্চলাইট এনেছিলাম ভাগ্যিস। অনেকটা চলার পর অন্ধকার কমে এল।

হ্যাঁ, রামুর কথাই সত্যি। আমের গাছে ভিড়ে শাল-মহুলের দেখা পাওয়াই ভার। গাছে গাছে কাঁচা আমের লোভনীয় দৃশ্য আমার মতো রসনাবিলাসীর কাছে স্বর্গ সুষমার কিছু কম নয়। কিছু আম পেড়ে ব্যাগে ভরলাম।

চারপাশের জঙ্গলটা আরো পাতলা হয়ে আসছে। কিছুটা হাঁটতেই সামনে ছোট্ট টিলার মতো। টিলার আশেপাশে বিচিত্র নকশাকাটা সব পাথর ছড়ানো ছিটানো। টিলার দিকে এগোতেই নজরে পড়ল একটা গুহামুখ। অতি সাবধানে গুহার ভেতরে ঢুকতে লাগলাম।

গুহাটা পরিস্কার। কোথাও হাড়ের টুকরো বা নোংরা নেই। চারিদিক অদ্ভুতরকমের পরিস্কার। এর অর্থ এখানে যাই থাকুক না কেন কোন বন্যপ্রাণী থাকে না। হিজুর চেহারা দেখার মতো। সে প্রাণপণে তেত্রিশকোটি দেবদেবীর নাম জপে চলেছে। আমি আর থাকতে পারলাম না।

-কি ব্যাপার হিজু, এত অস্থির হওয়ার কি আছে ? দেখছ না জায়গাটা কেমন ঝকঝকে তকতকে। এখানে ভয়ের কিচ্ছু নেই।

-সিটাই তো ভয়ের দাদাবাবু। ইখানে কোন জানোয়ার নয়, তিনি থাকেন।

-তিনি ?

– ‘জোহার’ মুয়া বাবা ! তোমার চরণে শতকোটি দণ্ডবত। আমার বাবারে বাঁচাও। ও আমার বুকের ধন ঠাকুর। তার বদলে আমারে নাও বাবা।

আমার আর কিছু বলার ছিল না। আমি এগোতে থাকলাম। কিছুটা পেরিয়েই একটা বাঁক। বাঁকের শেষে একটা বিশাল হলঘর। হলঘরটির দেওয়াল স্বচ্ছ কাচের মতো উপাদানে তৈরি। যদিও গোটা টিলাটা গ্রানাইট আর লাল মোড়াম পাথরে নির্মিত। হলঘরের একপাশের দেওয়ালের নিচে একটা বেদী। বেদীর উপর একটা পাথরের মূর্তি। মূর্তিটার মাথার পিছনে সূর্যের মতো অরা। মুখটা অনেকটা পশু ও মানুষের সংমিশ্রন। মূর্তিতে হাত দিতেই একটা অপার্থিব রশ্মিতে ভরে গেল গোটা ঘর। আর আমরা মেঝে ভেদ করে তলিয়ে যেতে লাগলাম।

কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না। জ্ঞান হতেই দেখি একটা ধাতব ঘরের মধ্যে আমরা পড়ে আছি। পাশে হিজু। হিজুকে ডাকাডাকি করতেই হিজু ধড়ফড় করে উঠে বসল। তখনই আমার চোখ গেল ঘরটার একপাশে একটা গর্তের মতো। আর সেই গর্তের কাছেই পড়ে আছে রামু ও তার বন্ধু দুইজন।

রামু ও তার এক বন্ধু সদানন্দের জ্ঞান এলেও পটলের দেহ ততক্ষণে নিস্প্রাণ হয়ে গেছে। গর্তের অন্যদিকে  যেতে হবে। যা থাকে কপালে।

গর্ত হতে বেরোতেই দেখলাম জায়গাটা টিলার পিছনের অংশ। আর বিলম্ব না। বাড়ি ফিরতে হবে সত্ত্বর। হিজুর কাঁধে পটলের দেহ। জঙ্গল ডিঙ্গিয়ে যখন বাড়ি এলাম ঘড়িতে রাত এগারোটা পঞ্চান্ন।

আর নয়। ঘুম আসছে।

……….( চলবে   )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *