মুয়াদেবের শাপ  // সুব্রত মজুমদার // ভাগ – ৪

42

১৯শে এপ্রিল 

আজ সারা দিনটাই কলকাতায় ছিলাম। বুড়ো অনেক জ্ঞানী, তাছাড়া পড়াশোনাও করে অনেক। বাড়িতো নয় যেন বইয়ের আড়ৎ। যাইহোক মুয়াদেবের সন্মন্ধে কিছুটা জানা গেল বুড়োর মুখে। প্রাচীন আদিবাসী ধর্মগুলোতে তাদের সৃষ্টিকর্তার আকাশ হতে আসার কল্পনা করা হয়েছে। তাহলে কি দানিকেন সাহেবের তত্ত্বই সত্যি। 
           অ্যারিক ভন দানিকেন অ্যালিয়েন থিয়োরির একজন সমর্থক তথা প্রাবন্ধিক ও লেখক। তিনি দাবি করেন যে অ্যালিয়ানরা এই পৃথিবীতে এসেছিল। আমরা যাদের দেবতা বলি তারা আসলে পরগ্রহী প্রাণী যারা এসেছিল এই পৃথিবীতে এবং সৃষ্টি করেছিল উন্নত সভ্যতার। আমরা অনেক কিছুকেই নিছক প্রবাদ ও কুসংস্কার বলে এড়িয়ে যাই। 
ইতালির ভ্যাল কোমোনিকায় পাওয়া প্রাচীন Petroglyph গুলিতে যে নভোযাত্রির মতো শিরস্ত্রানে ভূষিত মানুষের ছবি দেখা যায় সেগুলি কিসের ইঙ্গিত করে ! ভারতের বৈদিক গ্রন্থেও আছে আকাশপথে ও মহাকাশে ভ্রমনের কথা। ঋষি ভরদ্বাজের বৈমানিক শাস্ত্র আজ বৈজ্ঞানিক গবেষনার বিষয়। 
               সুদূর ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় আছে গিলগামেশের কথা। গিলগামেশ গিয়েছিলেন মৃত্যুর দেশে। আমাদের দেশের নচিকেতাকেই কেন বাদ দিই। নচিকেতা গিয়েছিল ষযমের বাড়ি মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে। মিশরের পিরামিড,বারমুডা ট্রায়েঙ্গেল আরো কত কি রহস্য আছে যার সত্য উদঘাটন আজও সম্ভব হয় নি। 
ইস্টার দ্বীপের মূর্তিগুলোর কথাই ভাবুন, কেই বা বানালো ওগুলো ? বুড়োর মতে এলিয়ানরা এসেছিল। ফিরে যাবার সময় তারা ঐ মূর্তিগুলো তৈরী করে যাতে ভবিষ্যতে কোনোদিন ফিরে এলে ঐগুলো দেখে সঠিক স্হানে অবতরণ করতে পারে। 
অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছি। ডায়েরি লিখতে যাব এমন সময় দেবলীনা হাজির। 
– কি হচ্ছে ? জীবন কাহিনী লিখছ বুঝি ? 
– আরে না না ! এসো এসো। তারপর বলো এত রাত হলো তবুও চোখে ঘুম নেই কেন ? 
– একসাইটেড বস্। অনেকদিন পর একসাথে আমরা। কাল সকালেই সোজা প্রেমার কাছে। তারপর সময়মতো অকুস্থলে। 
– তাহলে যাও ঘুমিয়ে পড়ো। রাত অনেক হয়েছে। 
আমি চাইলেও বিধি বাম। দীর্ঘক্ষণ ভাটানোর পর দেবলীনা নিজের ঘরে গেলে লিখতে বসলাম। 
২০শে এপ্রিল 
প্রেমার বাংলোতে এসেছি। আসার সাথে সাথেই উষ্ণ অভ্যর্থনা। স্টেশন হতেই লোক ছিল। প্রেমার ড্রাইভার। প্রেমা অনেকটাই পাল্টে গেছে। সেই চপলতা তার আর নেই। জিন্সের সাথে চুড়িদার আর দোপাট্টা। নখগুলো সুন্দর ভাবে ম্যানিকিওর করা। এত সময় যে কি করে পায় ভগবানই জানে। 
– “তারপর, কেমন আছো বলো।” প্রেমা আমার কাঁধে হাত রাখে। 
– প্রেমা, আমি তো ভালোই আছি কিন্তু তুমি বোধহয় ভালো আর থাকবে না। 
-“ও, এই ব্যাপার !” বলে আমার কাঁধ হতে হাত নামিয়ে নিল প্রেমা। 
– ” এতটা পজেসিভ আমি নই। তবে ওর দিকে হাত বাড়ালে আমি স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল এক করে দেব। ” দেবলীনা বলে ওঠে। ও আমার ব্যাপারে কতটা পজেসিভ তা ওর কথাতেই ক্লিয়ার হয়ে যায়। 
দুপুরের খাবার সরু চালের ভাত, অড়হড়ের পুরু ডাল, খাসির মাংস, সব্জি ও চাটনি। খেয়ে উঠতেই রান্নার মাসি একগাদা ফল কেটে এনেদিল। আমার আপত্তি থাকলেও দু’এক টুকরো মুখে তুলতেই হল। রাতের আয়োজনটাও কম হয়নি। ফ্রায়েড রাইসের সাথে চিকেন চিলি। তবে খাবারের শুরুতেই মোগলাই পরাঠা মটর পণিরের সাথে। আজ সারাদিন কেবল এনজয় করলাম। কোনো কাজের কথা হয়নি। তবে প্রেমার কাছ হতে চিঠিটা নিয়েছি। রাতে পড়ে দেখব বলে। 
টেবিল ল্যাম্পের আলোয় চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম। 
             ডিএসপি দিদিমণি বরাবরেষু, 
                                                       দিদিমণি, পত্রের প্রথমে আপনি মুয়াদেবের আশীর্বাদ জানবেন। কিন্তু আশীর্বাদ আপনাকে করা যায় কিনা তা ভেবে দেখা দরকার। আপনি যে গর্হিত কাজ করেছেন তা এ জঙ্গলের কেউই ভাবতে পারে না। সাপের ল্যাজে পা দিয়েছেন আপনি। আপনার বিনাশ নিকটই। মুয়াদেবের অস্তিত্ব কেউ মুছে ফেলতে পারে না। আমার কিছু নিরীহ সেবককে মেরে মেডেল হয়তো পেতে পারেন কিন্তু বাঁচা অসম্ভব। যাইহোক সাবধানে থাকবেন। মনে রাখবেন মুয়াদেবের নজর সবসময় আপনার উপর। 
                        চিঠিতে কোনো প্রেরকের নাম নেই। তাই ধরে নেওয়া যায় মুয়াদেব বা তার কোনো সেবকই এই চিঠি পাঠিয়েছে। আরেকটা ব্যাপার এই যে এই কয়দিন প্রেমার উপর কোনো হামলা হয়নি। সেটা হয়তো সিকিউরিটির জন্যে। অথবা এমনও হতে পারে যে চিঠি লিখেছে সে শুধু ভয় দেখাতে চায়। 
২১শে এপ্রিল 
আজ সকালে বটপাহাড়ী এলাকার যে আউট পোষ্ট আছে সেখানকার ইনচার্জ এসেছেন। ভদ্রলোক আমাকে ভালোভাবে চেনেন। কিন্তু আমি যে ডিএসপি ম্যাডামের বন্ধু তা জানলেন আজকে। 
– এই যে বিক্রমবাবু, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। ডিএসপি ম্যাডামের গায়ে একটা আঁচর লাগতে দেবো না। 
– “কিন্তু অফিসার, আপনার নাকের ডগাতে ঐসব ঘটছে আর আপনি কোন মুখে বীরত্বের হাঁক ছাড়েন ? 
-” আরে বিক্রমবাবু শুনুন তো। আমি আমার জানেপ্রাণে চেষ্টা করছি। সব গেটওয়ে সিল করে দিয়েছি।” অফিসার ভদ্রলোক রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে থাকেন। 
এমনসময় দেবলীনা ও প্রেমা এসে হাজির। ওরা বাজারে গিয়েছিল। প্রেমাকে দেখে বড়সড় স্যালুট মারেন অফিসার ইনচার্জ। 
-” সব রেডি আছে তো অফিসার ? ” প্রেমা বলে। 
– হ্যাঁ ম্যাডাম, বটপাহাড়ীতে জঙ্গলের পাশে একটা কটেজ আছে। আমার টিম রেইকি করে এসেছে। দশ বারোজনের একটা আর্মড ট্রুপ আমি ওখানে পাহারায় রেখেছি। তবে ম্যাডাম আপনি না গেলেই ভালো। বিক্রমবাবু আর এই ম্যাডাম তো আছেনই। আর আমি সবসময়ই নজর রাখবো। 
প্রেমা যেতে চাইলেও আমি আপত্তি করলাম। অনেক বোঝানোর শেষে প্রেমা ক্ষান্ত দিল। ঠিক হল আমরা দুজন মানে আমি আর দেবলীনা কাল সকালেই রওনা দেব। 
বিকালে চাইনিজ খেতে গেলাম। সারা বিকেল খুব মজা হল। দেবলীনা গান গাইল
                 ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।
ও সেই চোখে দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।
আয়    আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়।
মোরা   সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়।
…………..’ 
……….( চলবে   )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *