মুয়াদেবের শাপ // সুব্রত মজুমদার // ভাগ – ৬

45887

২৫ শে এপ্রিল 

.
গত দুইদিন লিখতে পারিনি। গত পরশু সকালে উঠেই ব্রেকফাস্ট করে রেডি হয়ে গেছি। দেবলীনা আমার আগেই উঠেছে। সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যেই নির্মলবাবু হাজির। দলে আমি, দেবলীনা, নির্মলবাবু আর মাষ্টারমশাই। মাষ্টারমশাই স্থানীয় রাস্তাঘাট চেনেন বলে তাকে দলে সামিল করা হয়েছে। আর নিরাপত্তার জন্য থাকবে স্পেশাল ফোর্সের ছয়জন কম্যান্ডো। আমরা আগে আগে যাব। কম্যান্ডোবাহিনী থাকবে আড়ালে। তারা গোপনে আমাদের অনুসরণ করবে। আর দরকার হলে ঝাঁপিয়ে পড়বে।  শত্রু যাতে সাবধান না হয় তাই এই ব্যবস্থা। 
.
             আমাদের দায়িত্বও ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। মাষ্টারমশাই পথ চেনাবেন। তিনি নিরাপত্তার কারনে আমাদের চারজনের পেছনে থাকবেন। আমাদের খাবারদাবার আর জলের দায়িত্ব তার উপর। মাষ্টারমশায়ের সামনে থাকবেন নির্মলবাবু। তিনি টর্চ আর ওয়াকিটকির দায়িত্বে। আর আর্মড বলে প্রয়োজনে মাষ্টারমশাইকে কভার করবেন। 
.
নির্মলবাবুর সামনে দেবলীনা। দেবলীনা মেডিক্যাল কিটের দায়িত্বে। সেও আর্মড। তাই তাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। আর সবার সামনে আমি। জিপে করে নদীর ধার পর্যন্ত এলাম। ক্ষীণস্রোতা নদী। তাই হেঁটে পার হয়ে গেলাম সহজে। মাষ্টারমশাইকে আজ অনেক বেশি স্মার্ট লাগছে। তিনি যেভাবে রাস্তা চলছেন সেটা স্বাভাবিক লাগছে না। নদী পার হয়েই জঙ্গল। নদীর তলদেশ হতে ওপাশের জঙ্গলের ভূমির খাড়াই পনেরো ফুটের মতো। এই খাড়াই মাষ্টারমশাই বেশ কায়দা করে উঠে গেলেন। আমার ও দেবলীনার খুব কষ্ট না হলেও নির্মলবাবুকে নিয়ে পড়াগেল বিপদে। তিনি কিছুটা উঠে আর তাল পাচ্ছিলেন না। 
.
-“কি অফিসার ফেঁসে গেলেন নাকি ? সাহায্য লাগবে ?” আমি মুখ নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। 
– “আর তো পারি না মশাই ! এজন্যেই বোধহয় বাবা পুলিশের পেশায় আসতে মানা করেছিলেন।” নির্মলবাবু সেই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় থেকেও একগাল হেঁসে উত্তর দিলেন। 
.
এমন সময় মাষ্টারমশাই একগাছা মোটা দড়ি ম্যাজিকের মতো বের করে আনলেন। আর তার একপ্রান্ত ঝুলিয়ে দিলেন নির্মলবাবুর দিকে। অনেক কষ্টে নির্মলবাবু দড়ি বেয়ে উপরে উঠলেন। 
.
-” সারাজীবন হাত পেতে ঘুষ নেওয়া ছাড়া আর শিখলেন কি !” মাষ্টারমশাই ব্যাঙ্গ করে উঠলেন। আজও তার ঠোঁটের কোণে সেই ক্রূর হাঁসি আমি দেখতে পেলাম। -“এই পরিস্থিতিতে কিভাবে নিজেদের মধ্যে কানেকশন বজায় রাখতে হয় তা আপনারও জানা নেই মাষ্টারমশাই।” দেবলীনা কঠিন কণ্ঠে জবাব দেয়। 
.
-” আরে ম্যাডাম, ছাড়ুন না; কে কি বলল তা না ভেবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। সামনে কি আছে আমরা কেউই জানি না।” নির্মলবাবু ধুলো ঝেড়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন। 
সামনের দিকে যত এগিয়ে যেতে লাগলাম ততই জঙ্গলের গভীরতা বাড়তে লাগল। আগেরবার ঠিক এমনই অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। চারজনের চারটে টর্চের আলোয় অন্ধকার আর রইলো না। আমি আগে আগে ডালপালা কেটে রাস্তা তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছি। পেছনে তিনজনে আমাকে অনুসরণ করছে। এমনসময় দেবলীনার তেষ্টা পেতেই মাষ্টারমশায়ের কাছে জলের বোতল চাইল। 
– একটা জলের বোতল দেন তো মাষ্টারমশাই, খুব তেষ্টা পেয়েছে। 
.
– এ এই যা ! নদী পার হবার সময় জলের ব্যাগটা পড়ে গেছে খেয়াল করিনি দিদিমণি। 
– মানে.. !!! কি বলছেন কি আপনি !  Are you creazy ! 
– “কি বলছেন মাষ্টারমশাই ! খাবারগুলো আছে তো ?” আমার উদ্বেগ বেড়ে যায়। 
-“ইয়ে মানে… সেগুলোও নেই। I am very very sorry to all of you.” মাষ্টারমশাই নির্বিকার মুখে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। 
আমার কাছে জলের একটা বোতল ছিল দেবলীনাকে সেটাই দিলাম। নির্মলবাবু এবার মাষ্টারমশায়ের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালেন। 
.
– সব চুকেমুকে যাক তারপর দেখাবো এই নির্মল সরকার কি চিজ। উল্টো করে টাঙ্গিয়ে পেটাবো। 
নির্মলবাবুর কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়ে মাষ্টারমশাই এগোতে লাগলেন। দীর্ঘ দু’ঘণ্টা হাঁটার পর আস্তে আস্তে জঙ্গলের ঘনত্ব কমে আসতে লাগলো। এতক্ষণে আমরা সবাই ক্লান্ত। এখানে শাল মহলের আধিক্য কমে এসেছে। বট আর আমের গাছই বেশি। একটা বিশাল বটগাছের নিচে বস পড়লাম। 
.
– “কিছু খাবেন আপনারা ?” মাষ্টারমশায়ের কথায় চমকে উঠলাম। 
– “খাবার তো পড়ে গেছে। আপনি আবার খাবার পেলেন কোথায় ?” দেবলীনা শুধায় ।
-“আজ্ঞে আমার গিন্নী বানিয়ে দিয়েছেন। সামান্য কিছু লুচি তরকারি আর মিষ্টি।” মাষ্টারমশাই লজ্জ্বায় কাঁচুমাচু হয়ে বললেন। 
.
-“বাহ্ ভালো ! সবকিছু পড়ে গেলেও বৌয়ের হাতের লুচি মিষ্টি দিব্যি বহাল তবিয়তে আছে। “দেবলীনা মাষ্টারমশায়ের দিকে তাকায়। মাষ্টারমশাই স্বমহিমায় উজ্জ্বল। 
-” আরে ম্যাডাম ওই গো বেচারা চেহারা দেখে বিশ্বাস করবেন না। মস্ত ঘোড়েল মাল এই মাষ্টার। আমার কথা বিশ্বাস করুন ম্যাডাম আমি অনেক কেপমারির কেস দেখেছি। এই খাবারে যে ঘুমের ওষুধ মেশানো নেই কে বলতে পারে।” নির্মলবাবু ঝাঁঝিয়ে ওঠেন। 
.
অবশেষে আমার হস্তক্ষেপে ব্যাপারটার নিস্পত্তি হয়। প্রথমে মাষ্টারমশাই খাবেন পরে আমরা খাবো। যাইহোক মাষ্টারমশাই আমার কথা মেনে নিয়ে নির্মলবাবুর পরিবেশিত খাবার খেলেন। আমরাও নিশ্চিন্তে ডানহাতের কাজ শুরু করলাম। শুধু নির্মলবাবু খেলেন না। খাওয়া দাওয়ার পর ঝিমুনি আসতে লাগলো। অনেক রাস্তা হেঁটেছি আর তার পরেই পেটে সুস্বাদু খাবার পড়ায় চোখ ভারি হয়ে আসছে। 
.
ঘুম যখন ভাঙলো তখন মাথাটা ভারি ভারি লাগছে। কয়টা বাজে দেখার জন্যে কব্জি ঘোরাতে গেলাম। একি ! হাত ঘুরছে না কেনো ? বুঝতে পারলাম হাতদুটো পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে। পাশেই দেবলীনা ও নির্মলবাবু। দেবলীনার হাতও পিছমোড়া করে বাঁধা। নির্মলবাবুর হাত বাঁধা নেই। তবে দুজনেই অজ্ঞান। 
আরে মাষ্টারমশাই কই ? কোথায় তিনি ? 
.

……….( চলবে   )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *