মুয়াদেবের শাপ // সুব্রত মজুমদার // ভাগ – ৭

subra
যতদূর দৃষ্টি গেল মাষ্টারমশাইকে কোথাও দেখা গেল না। প্রথমে নির্মলবাবুকে জাগাতে হবে। নির্মলবাবুর হাতে বাঁধন নেই। মাথা দিয়ে পা দিয়ে নানান ভাবে ঠেলাঠেলির পর নির্মলবাবু চোখ মেললেন। 
– আঁ.. আঁ.. আঁ… 
-ও নির্মলবাবু উঠুন উঠুন। এই নাগপাশ হতে বাঁচান শিগ্গির। 
-“কে.. কে..!!!”  নির্মলবাবু ধড়ফড়িয়ে উঠলেন। 
– আমি বিক্রম। দয়াকরে উদ্ধার করুন মশাই। 
.
নির্মলবাবুর ধাতস্থ হতে কিছুক্ষন লাগল। তারপর তড়িঘড়ি আমাদের দুজনের হাতের বাঁধন খুললেন। এতক্ষণে দেবলীনারও জ্ঞান এসেছে। সে হাতের পেশীগুলোকে সোজা করতে করতে বলে, “নির্মলবাবু আপনিই ঠিক। ব্যাটা মাষ্টার ঘুমের ওষুধ মেশানো লুচি আলুরদম খাইয়ে এই অবস্থা করেছে। কিন্তু আপনার এমন অবস্থা কেন নির্মলবাবু  ? আপনি তো কিছুই খাননি।” 
– আপনারা ঘুমিয়ে হয়ে যেতেই আমার সন্দেহ হয়। এ যে আসলে ঘুম নয় বেহুশী তা বুঝতে সময় লাগলো না। মাষ্টারকে কিছু বলতে যাব এমন সময় পেছন হতে কে মাথায় আঘাত করল আর আমার দুচোখে অন্ধকার।
.
যেখানে আমাদের রাখা হয়েছিল সেই জায়গাটা একটা ধাতব কক্ষ। আরে, আগেরবার অজ্ঞান হওয়ার পর এখানেই তো পড়েছিলাম আমরা !! কাছাকাছি সেই দরজাটা কোথাও আছে। 
-“তাহলে পটল এখানেই মারা গিয়েছিল ?” দেবলীনা বিস্ময় প্রকাশ করে। 
– “চলুন বিক্রমবাবু, দরজাটা খুঁজে বাড়ি ফেরা যাক” নির্মলবাবু তাড়াদেন। 
-“আমরা বাড়ি ফেরার জন্যে এখানে আসিনি নির্মলবাবু। আমাদের গোটা রহস্যের কিনারা করতে হবে।” দেবলীনা এগিয়ে যায়। 
.
নির্মলবাবু সন্মতি জানালে আমরা এগোতে লাগলাম। এখন আমরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। মোবাইল বা ওয়াকিটকি সবই মুয়াদেবের ভোগে গেছে। কিছুটা খোঁজার পর দরজাটা মিলল। আরে, পাশে আরেকটা দরজা না ! সেদিন তাড়াহুড়োয় লক্ষ্য করিনি। কিন্তু দরজাটা তো বন্ধ। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দেখলাম ঘরের কোনে একটা পেল্লাই সাইজের ক্রিষ্টাল বল। বলটাতে হাত দিতেই গোটা ঘর আলোকিত হয়ে উঠলো। বুঝলাম এটা উন্নত টেকনোলজির নমুনা। বলটার পাশে টেবিলে একটা পাজল।
– “এটা আবার কি ?” দেবলীনা পাজলটাকে নাড়াচাড়া করতে করতে বলে। 
-“কিছুই না ম্যাডাম। এটা খেলনা। মুয়া-মুয়ির দুলেরা লাল্লার টয়ি আছে।” নির্মলবাবু রসিকতা করে ওঠেন। দেবলীনা হাঁসতে থাকে। 
– ” টয় নয় মশাই, এটাই সম্ভবত গুপ্তদরজা খোলার চাবি।” আমি পাজলটাকে সলভ করার চেষ্টা করতে থাকি। একসময় পাজলটা একটা এলিয়েন শিপের আকার নেয়। আর শিপটার মাঝবরাবর একটি চাবির মতো টুকরো উঠে আসে। দেবলীনা সঙ্গে সঙ্গে টুকরোটা তুলে নেয়। 
-“চলো” বলে দেবলীনা টুকরোটা দরজার কি-হোলে ঢোকালো। আর সঙ্গে সঙ্গে একটা যান্ত্রিক আওয়াজ করে দরজাটা খুলে গেল। দেখি একটা সিঁড়ি পাকদিয়ে নিচে নেমে গেছে। নিচে বিশাল হলঘর আর তাতে নানান রকমের বিচিত্র যন্ত্র। বহুবর্ণের আলো জ্বলানেভা করছে। 
হলঘরের একপাশের দেওয়ালে বিশাল মনিটর। আর তার সামনে কন্ট্রোলপ্যানেল ও একটা চেয়ার। চেয়ারে বসে আছে অন্তত বারো-চৌদ্দ ফুট লম্বা এক অতিমানব। তার তিনটে চোখ। সবগুলোই বোঝা। ঘরের মাঝখানে একটা কফিনের মতো আধারে ঐরকমই দেখতে একটি দেহ। 
.
– “মুয়া-মুয়ি  !!!!” দেবলীনার মুখ হতে ফিসফিসে আওয়াজ বেরিয়ে এল। 
-“হ্যাঁ।” আমি মাথা নেড়ে সন্মতি জানালাম 
এমনসময় ওপাশ হতে গুলির শব্দ আসতেই আমরা কফিনটার পেছনে লুকিয়ে পড়লাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম গুলির আঘাতে ঘরের ভেতরের কোনো জিনিসের ক্ষতি হচ্ছে না। সম্ভবত কোনো বুলেটপ্রূফ উপাদানে এসব তৈরি। এমনসময় দেখলাম ঘরের ভেতরে চারজন লোক বন্দুক হাতে এগিয়ে আসছে। এদের মধ্যে দু’জন আমাদের চেনা। একজন মাষ্টারমশাই ও অপরজন বটপাহাড়ীর গাঁবুড়ো দীনেশ। 
.
আমি গুঁড়ি মেরে মেরে এগিয়ে গেলাম। নার্ভাস সিস্টেমের উপর আমার জ্ঞান যেকোনো ডাক্তারের থেকেও বেশি। তাই পিছন দিয়ে গিয়ে ঘাড়ের ঠিক জায়গামতো রদ্দা মারতেই একে দুজন শয়তান কাটা কলা গাছের মতো পড়ে গেল। এবার পালা মাষ্টারমশাই ও দীনেশের। 
ওদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তেই দুজনের হাতের অস্ত্র ছিটকে পড়ল নিচে। এতক্ষণে নির্মলবাবু ও দেবলীনা পিস্তল দুটো কুড়িয়ে ওদের কপালে ঠেকিয়েছে। 
-“কি মাষ্টার খবর কি ?” দেবলীনা হেঁসে ওঠে। 
-“আমদের ছেড়ে দাও নইলে মুয়াদেবের শাপে সবাই মরবে।” মাষ্টারমশাই ঝাঁঝিয়ে ওঠেন। 
-“আগে নিজে বাঁচ মাষ্টার। আমরা মরার জন্যেই এখানে এসেছি।” নির্মলবাবু হুঙ্কার ছাড়েন। দীনেশ নির্বাক। আসলে পালের গোদা এই মাষ্টারমশাই। 
.
অনেক জেরার পর মাষ্টারমশাই স্বীকার করেন যে তিনিই আসল অপরাধী। এই টিলার আশেপাশে অনেক হীরা কুড়িয়ে পাওয়া যায়। আর সেই হীরা চোরাচালানের জন্যেই এতসব কাণ্ড। তবে মুয়াদেবের কাহিনীতে কোনো ভেজাল নেই। আর তার প্রমাণ এই হলঘরের সর্বত্র বিরাজমান। 
আমার ধারণা মুয়াদেবের আকাশযান যখন এখানে নামে তখন যে প্রচণ্ড তাপের সৃষ্টি হয় সেই তাপের প্রভাবেই প্রকৃতিজাত কার্বন হীরাতে রূপান্তরিত হয়। মাষ্টারমশায়ের স্বীকারোক্তি চলাকালীন দীনেশ হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। নির্মলবাবু হকচকিয়ে গিয়ে গুলি ছোড়েন আর সেই গুলি আকাশযানের বিশেষ কোনো অংশে গিয়ে আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বিশাল গর্জনের সাথে সাথে কম্পন। আমরা  সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু সেটা সহজ বলে মনে হচ্ছে না। সামনের মনিটরে বিচিত্র লিপি ফুটে উঠতে থাকে। টিলাটা গায়ের সমস্ত মাটি পাথর ঝেড়ে ফেলে বিচিত্র আকাশযানের রূপ নেয়। একটু একটু করে উপরের দিকে উঠতে থাকে। এমনসময় আমার নজরে পড়ে ছোট্ট একটা দরজা। EXIT Door  !! 
.
আমি, দেবলীনা ও নির্মলবাবু তিনজনের দৌড়ে যাই দরজার দিকে। তারপর দরজাখুলে দিই ঝাঁপ। যা থাকে কপালে। 
তারপর আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলতেই দেখি সাবডিভিশনাল হাসপাতালের বিশেষ কেবিনে শুয়ে। সামনে ডাক্তার ও প্রেমা। আমি উঠতে চাইলে ডাক্তার মানা করেন। প্রেমা জানায় যে দেবলীনা ও নির্মলবাবু এখন সুস্থ্য। আমার আর দেবলীনার তেমন কিছু না হলেও নির্মলবাবুর একটা হাঁটু ফ্র্যাকচার হয়েছে। 
.
-“ঝাঁপ দেওয়ার পর আর কিছুই মনে নেই। কিভাবে সন্ধান পেলে আমাদের ?” আমি জানতে চাই। 
প্রেমা জানায় যে একটা বটগাছের মগডালে আমরা আটকে ছিলাম। আমাদের অলক্ষ্যে আমাদের পোষাকে জিপিএস চিপ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল আর সেই চিপ ট্র্যাক করে আমাদের উদ্ধার করে কম্যাণ্ডো টিম। তবে দীনেশ বা মাষ্টারমশাই দুজনেই নিখোঁজ। সম্ভবত তারা আর ফিরবে না কোনোদিন। মুয়াদেবের সাথেই চলে গেছে তারা তারকাদের দেশ পেরিয়ে। 
.
আমার দেওয়া তথ্যমতো টিলার আশেপাশে অনেক হীরা উদ্ধার করেছে পুলিশ। আজ দেবলীনাকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম নির্মলবাবুর বাড়ি। দেখি ঠ্যাং ঝুলছে। বিছানায় শুয়ে নির্মলবাবু। হাতে ফুলের বোকেটা দিতেই ছুড়ে ফেলেদিলেন 
– শালা মাষ্টার………….. 
[ প্রিয় পাঠক, বিক্রমের এই কাহিনী ভালো লাগলে তা জানান। আপনাদের ফিডব্যাক পেলে পরবর্তী বিক্রমকাহিনী লিখব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *