সমান্তরাল   // অভ্র ঘোষাল

abra
রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। রন্টি ঘুমিয়ে পড়েছে বহু আগেই। অনন‌্যা ছোটো মেয়েটাকে কোলে বসিয়ে অনুভবের জন‌্য অপেক্ষা করছে। রাত প্রায় এগারোটা। Phone-এ অনুভব জানিয়ে দিয়েছিলো office থেকে বেরোতে দেরী হবে ওর। কী একটা meeting আছে ওর ! 

.
বালতি বালতি তরল অন্ধকার যেন গড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর বুকে— তবুও অনন‌্যার যেন মনে হয়, অন‌্য দিনের তুলনায় অনেকটাই যেন দেরী হচ্ছে অনুভবের। Dinner-টা অনুভবের সাথেই করবে বলে বসে আছে। ওর দু-চোখে ঘুম জড়িয়ে পড়ছে ক্রমশই। হঠাৎ, কোলের ঘুমন্ত মেয়েটা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। অনন‌্যা বিছানায় শুয়ে শুয়ে তাকে স্তন দেয়। অনন‌্যার কান উদগ্রীব থাকে বাইরের উঠোনে একটা পরিচিত পদশব্দের আশায়। 

.
Calling bell-এর আওয়াজে চমকে ওঠে অনন‌্যা। মেয়ে ততোক্ষণে আবার শান্ত হয়ে গিয়েছে। তাকে আলতো করে শুইয়ে দিয়ে ঘুমের চোখেই গিয়ে খিল খুলে দেয় ও। অনুভব ঘরে ঢুকেই বলে, “তোমাকে আর বলে পারলাম না। বলেছি না, আগে গলার সাড়া নিয়ে তবে দরজা খুলবে? “
অনন‌্যা নিজের দোষ ঢাকা দেওয়ার চেষ্টায় বলে,”তোমার পায়ের শব্দ পেলেই আমি বুঝতে পারি, সাড়া নিয়ে কী কাজ?”

.
অনুভব হঠাৎ প্রগাঢ় আগ্রহে অনন‌্যাকে বুকের কাছে টেনে নেয়, ওর মুখটা ঘুরিয়ে ধরে তার নিজের মুখের দিকে। অনন‌্যাও ক্ষণিকের জন‌্য নিজেকে ছেড়ে দেয় স্বামীর হাতে;পরক্ষণেই অনুভবের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়, বলে, “ধুস, তুমিও যেমন! কী হলো কী হঠাৎ? বুড়ো হতে চললে — এখনও ওইসব? “অনুভব একটু আবেগতাড়িত হয়ে বলে, “তোমাকে যতো দেখি ততোই অবাক হই। তোমার ধৈর্য‌্য দেখে অবাক হই, তোমার ভালোবাসা দেখে অবাক হই! “অনন‌্যা কপট ক্রোধের স্বরে বলে, “তা, মশাইয়ের এই কানা রাত্তিরে হঠাৎ romanticism জাগলো কেন? কী ব‌্যাপার? “

.
“Promotion-টা পেয়েছি অনু! “, বলে অনুভব চুপ করে তাকিয়ে থাকে অনন‌্যার দিকে। “আমি তো বলেছিলামই, you deserve it ! যাক, খুব ভালো হলো! আচ্ছা, এবার চলো তো, খাবে চলো! “, চোখের কোণায় জমে থাকা আনন্দাশ্রু মুছতে মুছতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় অনন‌্যা। 

.
এবার অনুভবের মুখে হাসি দেখা যায় — চাপা দু:খ-মিশ্রিত হাসি। সমস্ত বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে ওর। তার বয়স হয়েছে? হ‌্যাঁ, অবশ‌্য আটচল্লিশ বছরটা নেহাৎ কম বয়স নয়। ওর মনে হয়, আজ এই জন‌্যেই হয়তো অনন‌্যার ওর প্রতি তেমন আকর্ষণ নেই। “বুড়ো” কথাটা কানে বাজলো ওর। ধীরে ধীরে ক্লান্ত পায়ে শোয়ার ঘরে ঢুকে যায় অনুভব। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসে ঠুং-ঠাং বাসনের আওয়াজ। ভালোবাসা আর অপেক্ষা সমান্তরাল ভাবে বয়ে যেতে থাকে অনন‌্যার আনন্দাশ্রুর স্রোতে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: