প্রেমের আঁতুড়ঘর  //  সত্যেন্দ্রনাথ পাইন

shruti

কলেজ পাড়ায় যুগল কিশোর কিশোরী- একে অপরের গায়ে, ভদ্রতকমা আঁটা। কিশোরীর মনের কুঞ্জ বনে অনেক কিশোরের তখন আনাগোনা, তবু তার পাশে সরল বোকা গ্রাম্য এক কিশোর। কিশোরী ধূর্ত। কিশোরকে বাগে আনতে প্রেমের অভিনেত্রী। সামান্যতম কথায় রং মাখানো জাদুকরীর ফাঁস। বোকা কিশোর মাথা নিচু করে অন্য ছেলেদের টপকে পাকা কুল হাতে পাচ্ছে ভেবে তার গায়ে গায়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে।

       কখনোও বাসে কখনোবা ট্রামে যাতায়াত। ভাড়া মাত্র ১৫পয়সা। তবু কিশোরী নিজের ভাড়া নিজেই কাটে। কিশোরের সাহায্য চায় না, নেয় ও না। যেন সততার তাজমহল। কিন্তু সিটে বসলে কিশোরের অঙ্গের ছোঁয়ায় ছ্যাঁকা লাগার ঢংয়ে অভিনয় করে। এটাই নাকি তার ভদ্র প্রেম। কিশোর ছেলেটি বোঝেনা। কারণ, বালতির জল আর পুকুরের জল সে একিই ভাবে।

কিশোরী সুযোগ নেয়।

       দুপুরে একা কিশোরকে নিয়ে সিনেমা দেখার অজুহাতে লোটাস, ওয়েলিংটন, জেম, লাইট হাউস, মেট্রো, সোসাইটি, গ্লোব, প্যারাডাইস, জ্যোতিতে টিকিট কেটে সিনেমা দেখায়— একটা চোরা দূরত্ব বজায় রেখে।

মৌলালির অন্ধ ফুটপাত অভিমানী কিশোরের সম্বিত ফেরাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। কিশোরী চাউমিন, সিককাবাব খাইয়ে আউটরাম ঘাটের সামনে কিশোর কে নিয়ে গঙ্গার হিমশীতল হাওয়ায় প্রেমের উষ্ণতা লাঘব করে। নয়তো কার্জন পার্কে, মিন্টু পার্কে, ইডেন পার্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিরালায় বসে জীবন পারাপারের ঢেউয়ে যখন সাঁতার কাটে– কিশোর ছেলেটি খেলনা বাঁশির মত তখন সুরের স্বপ্ন দ্যাখে।

জীবনসঙ্গীনী না ভেবেও একরাশ সুখের মালা গাঁথে। মেয়েটি ওড়ায় শ্বেতশুভ্র শয়তানির সন্ধিপ্রস্তাব। — যে পথে ছড়ানো অসংখ্য মায়াবী খুনসুটি, সামান্য অনুরাগ মেশানো ছলনার মুক্ত আর নিজেকে বাঁচাতে কিশোরের মগজে ঢেলে দেওয়া হাজারো উৎসুক টেনশন।এরপর অন্ধকার নামলে হেঁটে হেঁটে যে যার বাড়ি ফেরার পথে বিমানবন্দরের দুরন্ত হাওয়ার গতিবেগ নিয়ে কিশোরী সতীত্বের মথূরাপর্ব লীলা করে।

         কিশোর কথা ফুরোয়নি ভেবে চকিতে বিমান উড়ে যাবার পরও অভিসারের টানাপোড়েনে আনমনা হয়ে পড়ে। রাতে ঘুমাতে না পেরে চিঠি লেখে—যেটাতে বন্ধ মনের অন্ধকারগুলো বিছানো। প্লাষ্টিক বল যেমন শক্ত মেঝেতে অযথা লাফায়– কিশোরীও পরের দিন চিঠি পড়ে লাফায়। প্রেমের ছলনায় নিজের জয়ে আর কিশোরের পরাজয়ে নান্দনিক হয়, আপ্লুত হয়।

        প্রেম তবু চলে আপন সত্ত্বায় –! অকাতরে কিশোর বিলোয় যৌবনের উন্মাদনা- যুবতী যেগুলো কুড়িয়ে লোফালুফি খেলে—–!!

          কাটা ঘুড়ি ছটফট করে। কিশোরী ততক্ষণে যুবতী কুঞ্জ বনে দৃষ্টি বদ্ধ করে প্রণয়ের সাগরে ঢেউয়ে তোলে—“প্রাণ নাথ, আজকের মতো বিদায় জানাই”—!

           তারপর! একরাশ ব্যর্থতা আর প্রেমের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের পথ পেরোতে পেরোতে কিশোর দাঁড়ানোর জায়গা না পেয়ে অন্য পৃথিবীতে নিষিদ্ধ অভিযানে ব্যালকনির টিকিট কাটে, কিংবা গলায় মাফলার জড়িয়ে অন্ধের মতো অপরের হাত ধরে চলে। বিটনুন দেওয়া প্রেম তখনিই হঠাৎ করে শুনশান রাস্তায় অভিমানে গ্রামের নির্জনতা উপলব্ধি করে।নটেগাছ মুড়িয়ে যায়—সতী নারী অন্য প্রাণনাথের খোঁজ পায়।—-

         রিহ্যাব তৈরি হয়। মাধ্যাকর্ষণের পথে প্রেম মাটিতেই নেমে এসে “মায়ার”সঞ্চার করে। প্রেম পায় “পুনর্বাসন”! একরাশ আকাশ ভেঙ্গে রোদ্দুর হতে চাওয়া অমল কান্তি যেন নেশাতুর সম্মোহন আর বিধ্বংসী অতীত পেরিয়ে দুর্গম বন্ধুর আলোয় অবগাহন করে।

           কিশোর বালক এতদিনে বুঝি যুবকে পরিণত হয়ে বুঝতে পেরেছে সে একটা নড়বড়ে সাঁকো পেরিয়ে যাচ্ছিল— যেখানে মনখারাপের বাক্সে ‘ডেড লেটারের’ মত পড়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দ্যাখা অসফলতা “রিহ্যাব” মানে  প্রেমের আঁতুড়ঘর।ধর্ষিত পুরুষ পুনর্বাসন চায় রুদ্ধশ্বাসে— সেখানে    যেন”” আপন হৃদয় গহন দ্বারে কান‌ পেতে নিভৃত নীল পদ্মের আশায় অনিঃশেষ জেগে”থাকা।সোহাগি কুঞ্জ বন নকল সমীরনে অচেনা হয়ে মোহনার খোঁজ পেতে চায়। সাপলুডোর খেলায় আরোহন অবরোহনের নির্বিকার ‘বিধবা’ সুন্দরী তখন বুকে কৌটো বোমা রেখে ‘

“রেস্টরুমের’ গেস্ট হয়ে আকস্মিকতায় নতুন শ্রুতি নাটক লেখে।’ মায়াদর্শন’ হঠাৎই দৃঢ় হয়ে ফিরে পেতে চায় নতুন উপন্যাস। বরফের কাঠিন্য ও শৈত্য রোমান্টিকতায় দুরন্ত দুর্যোগে নিজের শানিত স্বাক্ষরে উচ্চারণ করে কিশোরীর বাছাই করা অতীত।

     অসহ্য অনুভূতির অসহনীয় উত্তাপ স্মৃতির গা’থেকে নিংড়ে অবগত হতে থাকে প্রেমের শৌভিক বাস্তবতা।অন্যায় ও অবিচার- ধর্ষিত তৃষ্ণা গ্লানি ও অপদার্থতার অসুখে শ্রবনহীন হয়ে পড়ে।

      কিশোরী যুবতীর টেকনিক মেশিন টা ফরোওয়ার্ড খেলে গোল করে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: