শেকড়ের স্মৃতি // ছোটবেলা – ৩৬ // বন্য মাধব

2112

আসতো দয়াল মানিক পীরের ফকিরও। ঘোড়ার পিঠের দু’পাশে চকরাবকরা কাপড়ের জোড়া লাগানো থলি। ফকিরদের গায়েও ঐ রকম আলখাল্লা। হাতে ইয়া বড় চামর। লম্বা চওড়া, বড় বড় সাদা দাড়ি ফকিরটি গান গাইত আর সঙ্গীটি দয়াল মানিক পীর বলে ধরতাই দিতো চামর দুলিয়ে দুলিয়ে। গৃহস্থরা খুশি হয়ে সাধ্যমতো এটা ওটা সেটা দিতো। কারো কারো তো মানত থাকতো।

বাড়িতে আসতো চৈত্রশেষে গাজনের দলও। আমি একবার গাজনের সন্ন্যাসী হয়েছিলাম। মালসায় রান্না হোত আলো চালের ভাত, আলু ভাতে। কাঁচা লঙ্কা দিয়ে সেই অমৃত ভোগ কলাপাতায় নিয়ে হাপুস হুপুস করে খেয়ে নিতাম। একেক দিন একেক বাড়িতে সন্ন্যাসীরা খাওয়া পেত। সকালে সন্ধ্যেয় ভোলেবাবার নামে জয়ধ্বনি দিতাম।

ভারি মজায় ঐ দিনগুলো কাটত। শেষদিন নতুন পেন্টুল আর গেঞ্জি মিলতো। কিন্তু ঝাঁপগাদায় ভোলেবাবা মোটেই আমার সহায় থাকতেন না। নিচে থাকা খেঁজুরের ডেগো দেখলেই খুব ভয় করতো। অথচ অন্যান্যরা পটাপট ঝাঁপাচ্ছে, ওদের কিচ্ছু হচ্ছেও না। বড়রা আমাকে চ্যাংদোলা করে ঝাঁপগাদায় এনে আলতো করে রাখতো। ওফ! কি ভয়!  কি ভয়!

খোল, ঢোল, করতাল, কাঁসি, বাঁশি নিয়ে বেরতো গাজনের দল। বাড়ি বাড়ি তারা যেত রঙিন সাজে সেজে। হর পার্বতীর সাজ আমরা ঘুরে ঘুরে দেখতাম। গ্রামের লোকেরাই গান বাঁধতো। একটা গানের লাইন আমার এখনও মনে আছে। এইখানেতে বাবা ছিল বাবা নিল কে? ও ভোলা মন, বাবা নিল কে? গান বাজনার সঙ্গে নাচও হতো।

আর ছিল বুক গুড়গুড় নিয়ে বাগদিপাড়ার কালীপুজো দেখতে যাওয়া। ঐ একটাই পুজো হতো সব পাড়া মিলিয়ে। পাঁঠাও বলি হতো। ক’দিন আগে থেকে তোড়জোড় চলতো। বড়রা কাজের ফাঁকে ফাঁকে কালীতলার ঘাস চাঁচতো, গোবর জল দিয়ে জায়গাটা নিকাতো, মাটি তুলে থানগুলো ঠিকঠাক করতো আর ইয়া বড় একটা কুমীর বানাতো।

আমরা জল তুলে দিতাম, চাঁচা ঘাস ফেলে দিতাম, কুমীরের গায়ে কাঁচা খেঁজুর লাগিয়ে দিতাম। পুজোর দিনে সন্ধ্যে পর্যন্ত দেখে বাড়ি যেতে হতো। বাতাস লাগবে, চুল কেটে নেবে, তেনারা চলাচল করবে কত কী বলা হতো। ভীতু আমরা তাই মেনে চলতাম। শেষরাতে মাদের সঙ্গে পুজো দেখতে যেতাম, ব্যস ঐটুকুই। এ পুজোটা ছিল আমাদের কাছে একই সঙ্গে ভয়ের ও আনন্দের।

৩৭

রামপুর হাটে সেবার রামায়ণ পালা এল। দল বেঁধে দেখতে গিয়েছি। রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, হনুমানকে দেখে মুগ্ধ। পালাকার আমাদের মুখের ভাষা মিশিয়ে পালা বানিয়েছেন। তাই বারবার করতালি পাচ্ছেন অভিনেতারা। আজন্ম শুনে আসা কাহিনীগুলো চোখের সামনে দেখছি। রামায়ণের চরিত্রগুলো যেন আমাদের ঘরের লোক! পালা শেষে মালা।

সব চরিত্রের গলায় থাকা মালার ডাক অর্থাৎ নিলাম হতো। একজন করে দর হাঁকে আর অমুকবাবু মানুষ ভালো / বিশটা টাকা দাম দিলো। এভাবেই চলতে চলতে যে বাবু বেশি দাম দিত মালাটা তার গলায় পরিয়ে পালার সবাই গান গাইত আর নাচতো। সবচেয়ে বেশি দাম উঠতো রামের গলার মালার। যে সেটা কিনতো তার নাম ও সামাজিক সম্মান দু’টিই বাড়তো। 

একবার আমাদের বাঁদর দোল খাওয়ার তেঁতুলতলায় জগদীশদার নেতৃত্বে যাত্রাপালা হয়েছিল। আমরা মাঝেমধ্যে রিহার্সেল দেখতে যেতাম। তখন কাকে কোন পাট দেওয়া হবে তা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছিল। তবে নায়কের পাটটা আমার বড় জ্যেঠুর বড় ছেলে চিন্ময়দার জন্যে বাঁধা ছিল। যেদিন ফাইনাল রিহার্সাল হল, বরোকরা নায়িকা এল, সেদিনও জগদীশদার উঠোন লোকে লোকারণ্য। নায়িকা ফর্সা টুকটুকে একটা ছোটখাটো মেয়ে।

আমাদের উত্তেজনা সময়ের সাথে সাথে বাড়তে লাগল। সময় পেলেই তেঁতুলতলায় জড়ো হওয়া। ধানক্ষেত সমান করা হলো। হলো চটের প্যাণ্ডেল। আগে ভাগে ভাল জায়গাও দখল করা হলো। সন্ধ্যে নামতে না নামতেই হ্যাজাক লাইট জ্বালা হলো। শুরু হলো যাত্রাপালা।

সব নট নড়ন চড়ন, নট ইসটেট নট টু। মঞ্চের নীচে যাত্রার মাষ্টার নিচু গলায় পম্প্ট করছে, চরিত্ররা ভুলে যাওয়া পাট সামাল দিচ্ছে। হাততালি  আর হাততালি, বিরাম নেই। পালা শেষ হয়েছিল তিনঘন্টায় আর আলোচনা যে কবে শেষ হয়েছিল তার ঠিক ঠিকানা ছিল না।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *