শেকড়ের স্মৃতি // ছোটবেলা – ৪০ // বন্য মাধব

65

সেবার বেশ ক’দিন ধরে ভারি বৃষ্টি হচ্ছিল। বেশি বৃষ্টি হলে আমরা গোলঘরে গরুর গাড়ির চাকায় বসে বা ঢেঁকিশালে বসে, দাঁড়িয়ে সমস্বরে চিৎকার করে ছড়া বলতাম, লেবুর পাতা করমচা / যা বৃষ্টি ধরে যা…….। বৃষ্টির শব্দ বাড়লে আমাদের গলার আওয়াজও বাড়তো। কিন্তু এবারের বৃষ্টি যতই বাড়তে লাগলো বড়দের চিন্তাও ততই বাড়তে লাগল। দিনরাত ঝরছে তো ঝরছে। এরমধ্যে একদিন সকালে শুনলাম, বড়রা রাতে নদীবাঁধে মাটি চড়িয়েছে। একের পর এক ধানক্ষেত ডুবছে, ডুবছে পুকুরও। ডাঙা জমির ধানও জলের তলায়।

নদীও ফুঁসছে। এই ভাঙে তো সেই ভাঙে অবস্থা। জোয়ারের সময় বাঁধ পাহারা বসে। একফসলি জমির দেশে নোনা জল ঢুকলে সব শেষ। শেষমেষ রক্ষা হল। দিন কুড়ি পর থেকে জল ভাঁটির টানে নামতে লাগলো। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

আর একটা ঘটনা মনে খুব দাগ কেটেছিল। সেবার রামপুর হাটে গেছি, হঠাৎ দেখি সবাই এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। পালা পালা আওয়াজও উঠেছে। তাড়াতাড়ি সাঁকো পেরিয়ে আমরাও বাড়ির দিকে ছুটছি। ছুটতে ছুটতে দেখি একটা লঞ্চ থেকে পুলিস কতকগুলো গরাণখেপো ভরা নৌকার দিকে গুলি চালাচ্ছে, নৌকাগুলো থেকেও তীর ছুঁড়ছে লোকেরা, নৌকো থেকে নেমে কিছুলোক নেমে হনহন করে দৌড়ে পালাচ্ছেও। আমরাও বাঁধ থেকে নেমে তাড়াতাড়ি চলছি। বাড়িতে এসে শুনি ওরা মরিচঝাঁপির উদ্বাস্তু। পরপর ক’দিন তারা উদভ্রান্তের মতো আমাদের পাড়া দিয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছিল।

আমাদের আশপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে হিন্দুরা যেমন ছিল, তেমন ছিল একঘর মুসলমান পরিবারও। তাঁরা আমাদের আদি বাড়ি ডিঙেভাঙার কাছাকাছি থেকে এখানে বসতি গড়েন। এই পরিবারের রহমত ও তার দাদা আমার সঙ্গে পড়তো। এদের সঙ্গে ভারি ভাব ছিল আমার। মুসলমানির অনুষ্ঠানে কি কি হয় এদের কাছে আমি সেটা জেনেছিলাম। পরিবারটির সঙ্গে বাবারও ভাল সম্পর্ক ছিল।

 ৪১

চোলাই, তাড়ি, হাঁড়িয়া, , দোক্তা, পান, সিদ্ধি এই নেশাগুলিই ছিল আমাদের গ্রাম ও আশপাশের গ্রামের সেই সময়কার চালু নেশা। আর চোলাই এদের মধ্যে জনপ্রিয় এবং সহজলভ্য ছিল। আমাদের পাড়াসহ সব পাড়ায় এটি তৈরির ভাঁটি ছিল। এই কারণে দু’একবার পুলিশ আসতেও দেখেছি পাড়ায়। আর চোলাই খেয়ে মাতলামি তো হরহামেশাই আমরা দেখতাম। সংসারে অশান্তি, বউ পেটানো লেগেই থাকতো। এমনকি পাড়ায় পাড়ায় ঝগড়াঝাঁটি, মারপিটও। আবার মারপিটে অংশ নেবার প্রস্তুতি নিতেও চোলাই দরকার পড়তো। বলবর্ধক আরকি! রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাবুদের বিঘের পর বিঘে জমি দখল হতে শুরু করে, ধান রোয়া আর ধান কাটার মরশুমে পাকা বাঁশের লাঠির সঙ্গে চোলাই এরও এইসময় একটা ভূমিকা ছিলো। আমাদের বাবুরা এই মারামারির মধ্যে ঢোকেন নি। তাঁরা আপোষ মীমাংসার পক্ষে ছিলেন। তাঁদের জমি ভেস্ট হলো, গরীবলোকেরা দশকাঠা করে ভাগে পেল। কিন্তু তাঁরা সংঘর্ষের পথে যান নি। চোলাইখোর লাঠিয়ালও পাঠান নি।

পান, দোক্তাও অনেকেরই প্রিয় নেশা ছিল। বিশেষ করে বড়রা এই নেশাটা করতো। জন মান্দেরও দোক্তা বানিয়ে মাড়ির পাশে গুঁজে রাখত। এটাকে খৈনিও বলা যেতে পারে। আর কেউ কেউ গুড়াকি দিয়ে দাঁত মাজতো। সিদ্ধিটা ছিল একেবারেই ঠাকুর বিসর্জন নির্ভর। প্রতিমা নিরঞ্জনের দিন এটি বড় বড় বালতিতে বানানো হতো। হাঁড়িয়া, গাঁজা ছিল হাটবারের নেশার জিনিস। হাঁড়িয়া অবশ্য বুনোপাড়ায় টুসু উৎসবেও তৈরি হতো। তাড়িটা শীতের জিনিস। তাড়ি খেয়েও মাতলামি লেগেই থাকতো।

বাবারা এক নেশার দেশ ছেড়ে অন্য দেশে এসেও এর হাত থেকে রেহাই পায় নি। আমাদের পাড়ায় তো জ্ঞাতিরাই চোলাই বানাতো। আর্থিক দুর্গতি এড়াতে তারা ঐ পথ নিতে বাধ্য হতো।

 ৪২ 

বিয়ের মরশুমে এ গ্রাম ও গ্রামে হরদম পালকির আগমন ঘটতো। মাটির উঁচু নিচু রাস্তায় কোন গাড়ি এমনকি ভ্যানও চলতো না। নতুন বউ আসতো পালকি চেপে, বিয়েও করতে যেতো পালকি চেপে। তবে সাইকেল চলতো দু’একটা, তাও সেটা বিয়েতে পাওয়া। আর চলতো গরু বা মোষের গাড়ি। বিয়ের কাজে, আত্মীয় কুটুম বাড়ি যেতে, আবার ধান চাল বওয়ার কাজে এটিই তখন একমাত্র বাহন ছিল। আর নদীতে চলতো লঞ্চ। আর সরবেড়ে থেকে ৪৮ নং বাস ঘটকপুকুর যেতো। 

বড়দার বিয়েতে কোলবর হিসাবে আমার প্রথম ও শেষ পালকি চড়া, বাড়ি থেকে সরবেড়ে। অনেক ঝাড়াই বাছাই করার পর আমাকে কোলবর হিসাবে নির্বাচিত করা হল। দাদার বিয়ে, এমনিতেই আনন্দ আর ধরে না, তার উপর কোলবর! ভাবা যায়! আনন্দে মাধাই নাচে ধেই ধেই! বড়দা ব্যাঙ্কে চাকরি করে। পাকা দেখা থেকেই বাড়িতে তোড়জোড় চলছে। ছোটদের তো শুধু দেখা, শোনা আর আনন্দ! বিয়ের দিন পালকি এল। আমরা ছোটরা বড়দের চোখ এড়িয়ে তার মধ্যে ঢুকছি আর সস্নেহ তাড়া খাচ্ছি। দেখে দেখে আর শেষ হয় না!

শেষে শেষ বিকেলে বর আর কোলবর নিয়ে চললো পালকি সরবেড়ে, হুহুমনা হুহুমনা……

আর পরের দিন সকালে ফিরতি পথে আমার জায়গা অনিবার্যকারণে দখল ! অতএব সবার সঙ্গে শ্রীচরণবাবুর ট্যাক্সি চেপে বাড়ি।

 ৪৩ 

আমাদের বেশ ক’টা পোষা বেড়াল ছিল। বাবার দু’ বেলা খাবার সময় তারা রোজ হাজির হতো। এদের মধ্যে হুলোটা ছিল একাষেঁড়ে। আগে সে ভালোগুলো খাবে, তারপর অন্যান্যরা থাকলে খাবে, না থাকে না খাবে – এটাই ছিল ওটার মানসিকতা। ফলে আমরা বা মা একটা লাঠি নিয়ে বাবার খাবার সময় বসে থাকতাম বিড়ালগুলোকে সমঝে রাখার জন্যে। বাবা পাতে কিছুটা ভাত ওদের জন্যে রেখে যেত। তাদের ভয় দেখাবার বদলে মারলে আমরাই বকুনি খেতাম। ওদের জন্যে বকুনি খেতে হলে অন্যভাবে আমরা শোধ তুলতাম। কোথাও একলা পেলেই ঢিলের বাড়ি বা গায়ে জল ঢালতাম। ভাবখানা এরকম – এবার তোরে কে বাঁচাবে?

ম্যাও এর চেয়ে কুকুরটা ছিল ভাল। তার ছিল একটা মালসা। তাকে ওতেই খেতে দেওয়া হতো। খেতো দেতো আর আমাদের সঙ্গে খুনসুটি করতো আর উঠোনে কাক এলে তাড়াতো, মাঝেমধ্যে বেড়ালও তাড়াতো। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে একটা সুন্দর কুকুরছানা আমার পিছু পিছু এলো। আমার সঙ্গ আর ছাড়ে না। তা বাপ থাক আমাদের বাড়ি। বাড়িরটার সঙ্গেও তার ভাব হয়ে গেল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে গোলমাল শুরু হলো। প্রথমে কামড়াবি তো আমাকেই কামড়ালো। খোলা পড়ে এনে কাটা জায়গায় লাগানো হলো। তারপর যাকে সামনে পায় তেড়ে কামড়াতে যায়। বাধ্য হয়ে বড়রা তার ভব লীলা সাঙ্গ করে দিল।

সেবার বড়দা একটা ক্যামেরা কিনে আনলো। ক্যামেরা কি বস্তু সেই প্রথম চাক্ষুষ করা। ফটো তুলবো বলে বনবিবি তলায় হাজির। মজাসে ছবি তোলা হলো। সানোদা ছবিগুলো তুলল। এবার অপেক্ষা পরের রোববারের জন্যে। ছবি এলো। কতবার করে দেখলাম। শুধু মনে হচ্ছিল, এবাবা, আমায় দেখতে এমন !

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: