তবু মনে রেখো  // সুব্রত মজুমদার // ১

15

                                                “রাস্তা ছাড়ো, রাস্তা ছাড়ো ! এমারজেন্সি পেশেণ্ট ।” দুজন ওয়ার্ডবয় একটা স্ট্রেচারে করে এক মূমূর্ষু বৃদ্ধকে নিয়ে গেল। বৃদ্ধের বয়স আশি না নব্বই তা বোঝা যায় না। বার্ধক্যে রুগ্ন ও নূব্জ্য দেহ বিছানার সাথে মিলিয়ে গেছে।পেছনের ওয়ার্ডবয়ের এক হাতে উঁচু করে তুলে ধরা স্যালাইনের বোতল, আর সেখান থেকে একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের নল বেরিয়ে গেছে। নলের শেষভাগ বৃদ্ধের হাতের ভেইনের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। সদর হাসপাতালের এমারজেন্সি বিভাগের সামনে স্ট্রেচারটি দাঁড়াল। একজন ওয়ার্ডবয়ের সাথে এমারজেন্সি কাউন্টারে গেলেন শঙকুদেব মৈত্র।

– “পেশেণ্টের নাম ?” কাঁচের ওপারে থাকা সুন্দরী অ্যাটান্ডেন্ট জিজ্ঞাসা করলেন।

– ভূবন চন্দ্র মৈত্র

– বয়স…

– সাতাশি।

– কে হন উনি…

– বাবা।

কাউন্টারে যখন সবাই ব্যস্ত ঠিক তখনই বাম হাতটা নড়ে ওঠে বৃদ্ধের। জ্ঞান ফিরে আসে। চাররপাশটা কেমন ঘোলাটে ঘোলাটে অস্বচ্ছ। মাথাটা ভারি ভারি লাগছে।” কি হয়েছিল আমার ?” নিজেকেই প্রশ্ন করেন ভূবনবাবু। হ্যাঁ হ্যাঁ.. মনে পড়েছে এবার। তার সবকিছু মনে পড়েছে।

আজ দীর্ঘ দুই বছর হতে তিনি শয্যাশায়ী। সেরিব্রাল থ্রম্বসিস। না পারেন উঠতে আর না পারেন বসতে। কিন্তু সবকিছুই দেখতে ও বুঝতে পারেন তিনি। ঠিক সিনেমার পর্দার মতো। সামনে সবকিছুই ঘটছে অথচ দর্শকের সেখানে কোনো হাত নেই।

অনেক কষ্টে মাথাটা ঘোরান ভূবনবাবু। চোখটা চলে যায় পাশের স্ট্রেচারে চোখবুজে পড়ে থাকা এক বৃদ্ধার উপর। পাকা চুল, মুখের চামড়া শত শত বলিরেখার প্রভাবে তুবড়ে গেছে। বুকের উপর রাখা একটা হাত। কিন্তু ও… ও.. কি ! ঝুলে পড়া হাতের চামড়ার উপরে মলিন একটা উলকি। অনেক কষ্টে পড়া যায়। ভূবন !!!

 সীমা ! এতদিন পর যে তোমাকে আবার দেখতে পাবো ভাবিনি। তুমি জানোনা সীমা আমি কত খুঁজেছি তোমাকে। দিনের পর দিন মাসের পর মাস শুধু আশায় থাকতাম তুমি আসবে বলে।

            দুই

একটা এঁদো পুকুরের পাড়ে ছিপ হাতে দুটো ছেলেমেয়ে মাছ ধরছে। ছোট্ট ছিপের সঙ্গে সুঁতলির দড়ি। আর দড়ির আগায় একটা ছোট্ট ঢিল বাঁধা।

– “দ্যাখ ভূবনা, তোর জন্যে আমি কিন্তু মার খেতে পারব না। মা বলেছে দুপুরে কোত্থাও না বেরোতে।” মেয়েটি তার ফিতে বাঁধা ঝুঁটিটা নেড়ে বলে ওঠে ।

-“যাবি ?….. যা।” ছেলেটি তার ছিপ গুটিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

– কিরে, তুইও চলে যাবি।

-“আমার একা একা ভালো লাগে না।” ছেলেটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মেয়েটা অতি সযতনে চোখের জল মুছে দেয় ছেলেটির। তারপর দুজনে গ্রামের দিকে রওনা হয়।

                     চন্দ্রপুরের ঘোষালেরা আদি বড়লোক। ঘোষাল বাড়ির কর্তা হরনাথ ঘোষালের বিশাল ব্যবসা। শহরের বুকে খানদশেক বাড়ি আছে তার। ‘সীমা গ্রুপ অব কোম্পানিস’ এর কি এমন ব্যবসা নেই যে নেই। হার্ডওয়্যার হতে গার্মেন্টস সবকিছুরই ব্যবসা হরনাথ বাবু করেন। তার সবেধন নীলমণী একমাত্র মেয়ে সীমা। সীমাকে  নিয়ে হরনাথবাবুর স্বপ্নের শেষ নেই।

                           এতসবকিছুর পরেও হরনাথবাবু গ্রাম্য মানুষ। কেমব্রিজের স্নাতক হলেও তিনি পুরোমাত্রায় স্বদেশী। বাঙালির দ্বারা ব্যবসা সম্ভব নয় এই প্রবাদকে তিনি মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়েছেন । তিনি তাই চান তার মেয়ে গ্রামের পরিবেশে মানুষ হোক।

                  হরনাথবাবুর স্ত্রী অনসূয়া খুবই ধর্মপ্রাণ মহিলা। ব্রত পার্বন পুজো ইত্যাদি লেগেই আছে। আর যে কোন পুজো পার্বনেই একজনেরই ডাক পড়ে – – তিনি হলেন কালি ঠাকুর ওরফে কালিময় মৈত্রের। কালি ঠাকুরের ছোট ছেলে ভূবন। সে বাপকে ছেড়ে একদণ্ডও থাকতে পারে না। ভূবনের তাই ঘোষাল বাড়িতে অবাধ যাতায়াত।

      গ্রামের স্কুলেই ভূবন পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। আর সীমা এক ক্লাস নিচে। সীমার মা সীমাকে বারবার বলে দিয়েছেন যে স্কুল থেকে আসার সময় সীমা যেন ভূবনের সঙ্গেই আসে। আজ রবিবার ছিল। দুপুরে দুজনে এসেছিল মাছধরা মাছধরা খেলতে। বুদ্ধিটা অবশ্য ভূবনেরই। সীমার আপত্তিতে বেশিক্ষণ খেলা হল না। আসার সময় দুজনের মনেই একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা অনুভূত হয়। হয়তো ভালোলাগা বা ভালবাসার এটা একটা অগ্রীম পূর্বাভাস।

              দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেল। ভূবন এখন ক্লাস এইটে পড়ে। পড়াশোনায় যথেষ্ট মেধাবী। প্রতিবছর ক্লাসে ফার্স্ট হয়। সীমাও কম যায় না। কিন্তু ইদানিং ভূবনের সাথে তার তেমন একটা মেলামেশা নেই। নাইন টেনের বড় বড় মেয়েদের সাথে তার ভাব এখন। আর সেজন্যই বয়সের তুলনায় পেকেছেও খুব।

এইতো সেদিন ক্লাস টেনের সুনয়ণা একটা ছেলের সাথে পালিয়ে গেল। বাপরে, সে নিয়ে কি হইচই। অনসূয়া দেবী মেয়েকে ডেকে পাঠালেন। বাড়ির কাজের মেয়ে কাজলির মা এসে জানিয়ে দিয়ে গেল।

– দিদিমণি, কত্তামা আপনাকে ডেকেছেন।

সীমা তার মায়ের কাছে যেতেই দেখে মা চেয়ারে বসে উল বুঝছেন। সীমা মায়ের কাছে এসে দাঁড়াল। ” মা তুমি কিছু বলছিলে ?”

– হ্যাঁ । স্কুলে কি হয়েছে জান তো ?

– না… মানে হ্যাঁ শুনেছি।

– তোমার বাবা খুব চিন্তায় আছেন। তার শরীরটাও ভালো নেই। তুমি সহজ সরল বোঝ সোঝ কম – – তাই তোমার জন্যে চিন্তা হয়

সীমা কিছু উত্তর দেয় না। সে পায়ের বুড়োআঙুল মেঝেতে ঘষতে থাকে। অনসূয়া দেবী এবার চোখ তোলেন। সীমার দিকে তাকিয়ে বলেন, “এই পরিবেশে তুমি গোল্লায় যাবে। তাই ঠিক করেছি মাধ্যমিকটা পাশ করলেই তোমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেব। সেখানে তুমি হস্টেলে পড়াশোনা করবে। তোমার বাবাও এটাই চান।”

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *