তবু মনে রেখো  //  ২  //  সুব্রত মজুমদার

32

পরেরদিন স্কুলে ভারি মজা হল। টিফিনের সময় মেয়েরা আর ছেলেরা দুটো গ্রুপ করে গানের লড়াই খেলা শুরু হল। প্রথমে টস করেই জিতল ছেলেরা। কিন্তু সীমা তা মানতে নারাজ।

-” এভাবে দুনম্বরি করলে চলবে না। আবার টস হোক। আর এই যে কি নাম যেন… এই মিষ্টার ? ” সীমা ভূবনের মুখের কাছে চুটকি বাজাল।

-” শ্রীমান শ্রীযুক্ত হরনাথ ঘোষাল। দিনে জ্বালি মশাল।” ভূবনের উত্তরে ছেলেরা একচোট হেঁসে উঠল।

-“ইউ বাস্টার্ড !!” প্রচণ্ড রেগে গিয়ে চড় মারতে গেল ভূবনকে। কিন্তু টাল সামলাতে পারল না। উল্টে পড়ল ভূবনের উপর। যাকে এই একটু আগে মারতে যাচ্ছিল তার বুকের উপরে লুটিয়ে আছে সে। যেন রসাল বৃক্ষের গায়ে পরম আদরে জড়িয়ে রয়েছে নরম পেলব একটা স্বর্ণলতা।

সবাই হেঁসে উঠলো দেখে ভূবন সীমাকে জড়িয়ে ধরে নিচে ফেলে দিল। তারপর উঠে দাঁড়াল। বাকি দিনটা দুজনের কেউই আর বিশেষ কথা বলেনি। দুজনের ভিতরেই হয়তো তৈরি হচ্ছে বড় কোন একটা ঝড়ের অঙ্কুর। এই নিস্তবদ্ধতাটা তারই প্রমাণ।

-“যা সিনেমার সিন দেখলাম মাইরি..! কি রে কেমন ফিলিংস হল একটু বল না।” অরুণীমা কৌতুহলী দৃষ্টিতে সীমার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়ল।

-” রাধা-কৃষ্ণের রাসলিলা। বুঝলি অরুণীমা, আমি নিশ্চিত মালটা ডুবে ডুবে জল খাচ্ছে।” পারমিতা ফুট কাটে।

সীমা কিছুই বলে না। শুধু কটমট করে দুজনের দিকে তাকায়। সীমার ভেতরের উত্তাল এই পরিস্থিতিকে বোঝার মতো ক্ষমতা আজ কারোরই নেই। সমুদ্রে যখন জোয়ার আসে তখন সবকিছু ডুবিয়ে দেয়। ক্ষণিকের মধ্যে লণ্ডভণড করে দেয় সমস্তকিছুকে । ভূবনের উপর তার একটা টান যে কোনোদিন ছিল না তা নয়। সেই ছোটবেলার ছেলেখেলাগুলো আজকে প্রেম হয়ে ধরা দেয় কেন ! কেন বারবার মনে হয় ভূবনের কথা। ভোলা যায় না, – – কিছু জিনিস সত্যিই ভোলা যায় না

-“কি রে, কি ভাবছিস ! বিরহ না পূর্বরাগ ?” অরুণীমা সীমাকে ধরে ঝাঁকুনি দেয়। সীমার চিন্তাজাল ছিন্নহয়। সবাই হেঁসে ওঠে।

-“রাধার কি হৈল অন্তরের ব্যাথা |

বসিয়া বিরলে থাকয়ে একলে না

শুনে কাহারো কথা ||” পারমিতার কাব্য চর্চায় আবারো হাঁসির রোল ওঠে।

-” এরও মনে হচ্ছে সুনয়ণা কেস ঘটবে। ” বর্ণালি এবার মারাত্মক কথাটা বলে বসে। সীমা রেগে যায়। সে বর্ণালির দিকে আঙুল তুলে বলে, “তুই যেমন পল্লবদার সাথে গুল খিলাচ্ছিস ! আই এম স্যরি ডিয়ার, আমি তোর মতো অন্তত নই। আমার ভেতরে শিক্ষা আছে।” এরপরেই গটগট করে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে। যাবার সময় কানে আসে বর্ণালির চিৎকার, ” কত আমার শিক্ষিত রে ! নিজেরটা দ্যাখ… নিজেরটা। পল্লবের মতো ছেলে তুই তো তুই তোর সাত পুরুষের ভাগ্যেও জুটবে না।

…. ” এর পরের কথাগুলো আর না বলাই ভালো। কারণ এতটা নোংরা শব্দ কোনো গ্রাম্য মেয়েলি ঝগড়াতেই শোনা যায়। এই অপশব্দগুলো শুনলে বাৎস্যায়ণও স্তম্ভিত হয়ে যেতেন। কারন কামকেলি হতে প্রজনন সমস্তকিছুই বিস্তারিত বর্ণনা ছিল তাতে।

মুখে বলা যত সহজ কাজে করে দেখানো অতটা বোধহয় সহজ নয়। সীমা ভূবনকে ভুলতে পারল না। বরং ভবনের প্রতি তার টান দিন দিন বেড়ে চলতে লাগল। দেখা হলেই দুজনের ঝগড়া হয়। আর দুজনেই অপেক্ষা করে থাকে দুজনকে দেখবার জন্যে। এরকমই একদিন লাইব্রেরিতে একটা বই নিয়ে দুজনের টাগ অফ ওয়্যার শুরু হল।

-“এক্সকিউজ মি, বইটা আগে আমি দেখেছি।” সীমা বইটা ধরে টান দেয়।

– ওরে আমার এক্সকিউজের ঠাকুমা, বইটা আমি খুঁজেছি এবং বইটা আমার।

– ভালো ভাবে কথা বল না হলে তোমার কপালে বিপদ আছে বলে দিলাম। আমার বাবা এই স্কুলের সেক্রেটারি। বাবাকে বলে তোমাকে স্কুল হতে বের করে দিতে আমার বেশি সময় লাগবে না।

– আর পারটা কি ? সেক্রেটারি বাপের সুপারিশেই যে ক্লাসে প্রমোশন পাও সেটা আমার ভালোই জানা আছে

– ইউ স্টপ….

-ইউ স্টপ

-ইউ….

-ইউ… উ… উ….

তর্কাতর্কি করতে করতে সিঁড়িটা হতে স্লিপ করে উল্টে পড়ে সীমা। পাশেই টেবিলের উপরে দাঁড়িয়ে থাকা ভূবনক হাতবাড়িয়ে কোলে তুলে নেয় সীমাকে। দুজন দুজনের দিক অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

সন্ধ্যার সময় সীমা তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে। মা স্নেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মেয়ের দিকে। তারপর কপট রাগের ভান করে বলেন, “ছাড় ছাড়.. ছাড় বলছি। এতবড় মেয়ে। তুই কবে বড় হবি বলতো ?”

– মা, এবার কিন্তু বেড়াতে যাবো গ্রীষ্মের ছুটিতে। আগেরবার যাওনি।

– সে তো তোর শরীর ভালো ছিল না বলে।

– এবার কিন্তু গোয়া ফোয়া নয়। পুরি যাবো। কোণার্কের সূর্যমন্দির আমার দারুণ লাগে।

– আচ্ছা রে মা আচ্ছা, তাই হবে।

-” আমার সোনা মা !! ” মা কে জড়িয়ে ধরে চুমু খায় সীমা। তারপর দুজনে মিলে নানারকম গল্পে মেতে ওঠে।

তিন

আজ পুরিতে এসেছে সীমা। হরনাথবাবু আসার সময় ভূবনকে সঙ্গে নিয়েছেন।

-“খুব স্মার্ট ছেলে। সঙ্গে থাকলে অনেক উপকারে দেবে। তাছাড়া গরীবের ছেলে তো, কোথাও বাইরে বেড়াবার সূযোগ হয়ে ওঠে না। তাই সঙ্গে নিলাম।” হরনাথবাবু স্ত্রীর কাছে ব্যাখ্যা দেন।

-“আমি কি তোমায় মানা করেছি। তবে পরের ছেলে এনেছো নজরে রেখো বাপু। কিছু একটা হয়ে গেলে জবাব দেবার কিছু থাকবে না। ” সীমার মা জামাকাপড়গুলো হোটেলের আলমারিতে রাখতে রাখতে জবাব দেন।

এদিকে সীমার মনে আনন্দের শেষ নেই। সারাটা রাস্তা সে এমন ভাব দেখাতে দেখাতে এসেছে যে ভূবনের তাদের সঙ্গে আসাটা সে ভালোভাবে নেয়নি। ট্রেনের এসি কামরাতে শীত শীত বোধ করছিল ভূবন। সীমার মা একখানা চাদর সীমার হাতে দিয়ে বলেন, “যা ভূবনকে দিয়ে আই।” সীমা চাদরটা ছুড়ে দেয় ভূবনের দিকে।

– চাদরটা নিয়ে আমাদের উদ্ধার করুন।

চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *