ভাবান্তরিত তথা অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে কিছু কথা // রণেশ রায়

213

নিচের ইংরেজি কবিতার ভাবানুসারে লেখা কবিতাগুলোর কিছু  স্কুল থেকে কলেজস্তরে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত । দেখা যায় মূল কবিতাগুলো বিদেশি ভাষায় ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনেক সময় সহজে বোধগম্য হয় না । ইংরেজি শব্দগুলোর সঠিক প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। অনেক শব্দ কবিতায় চলতি অর্থে ব্যবহৃত হয় না। পুরো লেখাটা ধরে তার অর্থ বুঝে নিতে হয়। আমরা যারা অনুবাদ করি তারা শব্দ ধরে করি না ।

ভাবটা ধরে অনুবাদ করতে হয় । ভাবটাকে ধরে রাখার জন্য সঠিক শব্দ চয়ন জরুরি । শিক্ষাথীরা তাই মাতৃভাষায় ভাবানুসারে লেখা কবিতাটা যদি পড়ে  নেয় তবে মূল কবিতাটা সহজে বুঝতে পারে। কবিতা বুঝতে হয় তার ভাব দিয়ে। শব্দের আভিধানিক অর্থ দিয়ে সেটাকে উপলব্ধির স্তরে নিয়ে যাওয়া যায় না। সেই অর্থে বাংলায় লেখা এই কবিতাগুলো ঠিক অনুবাদ কবিতা নয় ভাবটা বজায় রেখে যে কবিতা লেখা হয় তাতে লেখকের সৃজনশীলতা প্রকাশ পায়।

আর এই আত্মস্ত করার প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ হয় মাতৃ ভাষায়। তাই মাতৃভাষায় পড়ে পরে ইংরেজিটা সহজে পড়ে নেওয়া যায় কারণ কবিতার ভাবটা মাতৃভাষায় আমাদের শয়নে স্বপনে খেলা করে । তাই আমরা বলি বিদেশী ভাষা শিখতে গেলে তার রস পেতে গেলে মাতৃভাষার চর্চা করতে হয় ।

ভাবান্তর তথা অনুবাদ সাহিত্যের একটা বৃহত্তর দিক আছে যেটা নিয়ে দুচারটে কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। আমি সাহিত্যের লোক নই। কোন বিদেশি ভাষায় পন্ডিত নই। তাও যেটা ভাবি সেটা বলার স্পর্ধা দেখাচ্ছি। নিজে কিছু কবিতার ভাবান্তরের চেষ্টা করেছি। সেগুলো পরিবেশন করার আগে নিজের কয়েকটা  কথা নিজে বলে নিচ্ছি।

কোন কবিতার ভাবান্তর করা হলেও যিনি এটা করেন তাঁর ভাবনাটা নিজের অজান্তে হলেও জুড়ে যায় ভাবান্তরিত  কবিতাটিতে কবির ভাবের সঙ্গে। কবিতাটি অন্য মাত্রা পায়। স্বাদটা বদলায়। এখানে যিনি ভাবান্তরিত করেন তাঁর স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সেটা আরও ভালো হতে পারে আবার কারও ভালো নাও লাগতে পারে। এই প্রক্রিয়ার সাহিত্য সৃষ্টিতে দুটো সংস্কৃতির মধ্যে বিরোধ ও মিলনের মধ্যে দিয়ে এক নতুন সংস্কৃতির সৃষ্টি হয়। এক ভাষাভাষীর মানুষ অন্য ভাষাভাষীর মানুষের সঙ্গে মননের দিক থেকে একাত্ম হয়। মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুভাষ মুখোপধ্যায়ের অনুবাদ ধর্মী তথা ভাষান্তরিত কবিতায় সেটা আমরা পাই।

বোধ হয় এটাকেই সংস্কৃতায়ন বলা হয়। ইংরেজিতে একে সিন্থেসিস বলা চলে। রবীন্দ্রনাথের ‘দুঃসময়’ এমনি একটা অসাধারন কবিতা যেটাতে ইংরেজ কবি শেলীর ‘Ode To The Nightangle’ কবিতার ভাবটি রবীন্দ্রনাথের স্বকীয়তায় প্রস্ফুটিত। মধুসূদনের কবিতার ভান্ডারও এই স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ। নজরুলের কবিতায় উর্দু ভাষার অসাধারণ সমন্বয় ধরা পড়ে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘জেলখানার চিঠি’ তুরস্ক কবি নাজিম হিকমতের কবিতার অসাধারণ ভাবান্তর। আমরা যারা রাজনৈতিক কারণে জেলে ছিলাম তাদের এই কবিতাটা হৃদয় স্পর্শ করে যায়।

মনে হয় আলিপুর প্রেসিডেন্সি বা বহরমপুরের কোন জেলে বসে আমাদের কোন কমরেড এই কবিতা লিখে গেছেন। এখানেই অনুবাদ কবিতার তাৎপর্য, সার্থকতা। সাহিত্যের আন্তর্জাতিকরণের মাধ্যম হলো এই ধরণের কবিতা। আন্তর্জাতিকতাবাদের সাংস্কৃতিক ভিত্তি এটা। একে নেহাৎ অনুবাদ কবিতা বলে নকল বলে উপেক্ষা করার একটা প্রবণতা অনেক উন্নাসিক ব্যক্তির মধ্যে আছে। তাঁরা এর মধ্যে লেখকের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব দেখেন না। সাহিত্যকে মানবতার মহাসাগরের মোহনায় মিলতে দেখেন না। এটা খুব দুর্ভাগ্যের। এক ধরনের অহং এর পেছনে কাজ করে।

.

 

.

The Road Not Taken
BY ROBERT FROST

কবিতার ভাবানুবাদ

এর সঙ্গে আমার ভাবনা যুক্ত হয়েছে।

.

যে পথে হয় নি চলা  //  রণেশ রায়

শীত পড়েছে কুয়াশা ঘন আকাশ,

সামনে পাতাঝরা পীত বর্ণের জঙ্গল

অনিশ্চয়তার গন্ধে ভরা বাতাস,

মাঝে দুটি রাস্তা চলে গেছে দুদিক ধরে

বেছে  নিতে হয় দুটোর একটা,

যে পথ বৈঠা বায়

আমার প্রত্যয়ে আমার চেতনায়।

আমি চলি একটা রাস্তা অনুসরণ করে,

দূরে কোথাও বাঁক নিয়েছে

হয়তো চলে গেছে অজানা কোন দিশায়।

পথিক আমি, তাও পথ ধরে চলি

জানি না সে পথ পৌঁছবে কোথায়!

রয়ে গেল অধরা

হলো না অন্য পথ ধরা,

ভাবি ও পথে চললেই ভালো ছিল

খুঁজে পেতাম নিশানা

দূর হতো অনিশ্চয়তা আমার;

কিন্তু পথ যে দুটোই অজানা

ধরতে হয় একটা কোন ।

যদি আমার পথের সঠিক নিশানা,

সমস্যা থাকে না তবে

হোক না শরীর ক্ষত

কণ্টকিত আমার সে পথ

সে পথেই পৌঁছব নিশান হাতে।

তবে জানা নেই আমার কোনদিকে

কোথায় আমাকে নিয়ে যাবে,

যদি দুটো পথ দুদিকে

মিলব না আমি কারো সাথে

সবাই যে চলছে অন্যপথে,

সেটাই হয়তো পার্থক্য গড়ে দেবে।

আমি চলি ভিন পথে

যে পথ বেঁচে আছে আমার চেতনায়

আশা রাখি পৌঁছব নিশান ধরে।

যদি ভুল পথে যাই তাও যেন নিরাশ না হই,

বিকল্প পথ যদি সঠিক দিশা দেখায়

আপত্তি করব না আমি,

ক্লান্তিহীন আবার শুরু আমার যাত্রা,

আমি বয়ে চলি আমার বার্তা

চলব আমি যে পথে হয়নি চলা

পথিক আমি দিগন্ত ধরে

আমার অনন্তে যাত্রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *