টুকিটাকি // প্রস্তুতিবেলা – ৩ // বন্য মাধব

12

আমরা ছোটবেলায় নানান জিনিস দিয়ে দাঁত মেজেছি। সক্কালবেলা ঘুঁটের ছাই তো ছিলই, ছিল খেঁজুর, বাবলা, নিমের ডাল, আর ছিল ছুটির দিনে দুপুরে নুন, সরষের তেল দিয়ে দাঁত ঝকঝকে করা।কোলগেটও ছিল, ব্যবহার করতে ইচ্ছে করতো না। ঝকঝকে দাঁতে কোনদিন একটুও অসুবিধা হয় নি। 

কিন্তু, মনে হয়,  উপরওলার কাছে এতো বড় বড় দেঁতো রুগিরা নালিশ করলো যে, উনি ইচ্ছে করেই বাঁদিকের উপরের মাড়িতে একটা এক্সট্রা দাঁত জোর করে গজিয়ে দিলেন। তো, প্রথম দিকে এর কুফল চোখে পড়ে নি, পড়ল সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়বার সময়। 

ক’দিন ধরে কলেজে গন্ডগোল চলছে। মুড়ি মুড়কির মতো বোম পড়ছে। শিয়ালদা চত্বরের সব কলেজেই তখন এই রোগে ভুগছে। সেদিনও যথারীতি বোমবাজি শুরু হলো। ক্লাস বন্ধ। বাবলগাম চেবাচ্ছি আর মূল দাঁত ও এক্সট্রা দাঁতের মাঝখানে ওটা ঢোকাচ্ছি। আরামও লাগছে। আরামটা যে ব্যারাম ডাকবে সেটা তখন বুঝিনি। সন্ধ্যেবেলা থেকে মাড়ি ফুলতে শুরু করলো।

সকালে ফোলা ও ব্যথা বাড়ল। ডাক্তার দেখানো হলো। ফোলা ব্যথা দু’টোয় গেলো। কিন্তু বাঁ পাশের মাড়িতে চেবাতে গেলেই দুই দাঁতের ফাঁকে খাবার ঢুকে যাচ্ছে। অস্বস্তি হচ্ছে। দেখে শুনে এ পাশের মাড়িতে চেবানো বন্ধ করে দিলাম। এভাবেই চলছিল। কিন্তু যত দিন যায়, শোষ টানলে ওখান থেকে রক্ত আসতে লাগল। আবার ছোট! তবে এবার অবশ্য অফিসের কাছে, সল্টলেক স্টেট জেনারেল হাসপাতালে। দেখে দশাসই চেহারার ডাক্তারবাবু দাঁতটা তুলে ফেলতে বললেন। 

 ৪ 

নির্দিষ্ট দিনে একটা আলগা ভয় নিয়ে হাসপাতালে গেলাম বাইরে থেকে এক্সরে করে। ভেতরে যেতেই দশাসই ডাক্তারবাবু সব দেখলেন, বললেন আমি তো ক’দিন পর ট্র্যান্সফার হয়ে যাব, পরের জন এসে তুলবেন। অগত্যা ফিরে আসা।

আবার চুপচাপ, চলছে চলুক! এবার কয়েক বছর পর আর আহমেদ ডেন্টালে দেখালাম। পনেরো দিন পর স্কেলিং এর ডেট পড়ল। ধ্যুত তেরিকা, এলাম এক কাজে আর……।  কত পনেরো দিন চলে গেলো, যাকগে না হয় এক মাড়িতেই চেবাবো!

কয়েক বছর চলার পর আবার গেলাম ঐ হাসপাতালে। সঙ্গে সঙ্গে এক্সরে করার কথা বলা হল। পাশের গলি থেকে তড়িঘড়ি করে আনলাম। ডাক এলো। দাঁত তোলা হবে। কিন্তু সঙ্গে লোক আনা হয় নি যে! সুতরাং পরের ডেট দিল। আর যাওয়া হলো না। দিন চলে তো যাচ্ছে!

এইবার মেয়ে যখন পিজিতে নার্সিং পড়তে এল, আমিও দাঁত আর ঝাঁঝরা শরীরটা দেখাবার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেললাম। প্রথমে হাড়। তারাও মেডিকেলের মতোই টোটাল হিপ জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্টের পরামর্শ দিল। আর দিল ফিজিও থেরাপি। ভাল রে ভাল। আরেক দিন গেলাম কান দেখাতে। ড্রপ দিল। ভাল। চোখটাও একদিন এসে দেখালাম। এবার লিভার আর কিডনি। ভিড় দেখে অতোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট ভোগ করতে চাইলাম না। শেষে এলাম দাঁতে। এখানে আবার বাইরে থেকে স্কেলিং করে আসার পরামর্শ দেওয়া হল। অগত্যা থাক চুপচাপ!

চলছিল কিন্তু এবার কাছের দূরের নানাজনের কাছ থেকে অনুযোগ আসতে লাগল। মুখ থেকে নাকি গন্ধ আসছে। দু’বার ব্রাশ করে আর দুপুরে লিকুইড কোলগেট ব্যবহার করেও সে গন্ধ আটকানো গেল না। ঘনঘন জায়গাটা ভারী হতে লাগলো। সেনসোডাইনও ব্যবহার করলাম। এরমধ্যে একদিন ক্যান্টিনে রুটি মাংস খেতে গিয়ে দাঁতের ফাঁকে ঢুকলো। ভাইপোকে দেখালাম, ওর বিডিএস শেষের মুখে। কিছুদিন ভাল থাকলাম। এবার দু’পাটি দাঁতের প্রতিটিই ব্যথা। চিবিয়ে খেতে গেলে পারছি না। ভাইপোর সঙ্গে পরামর্শ নিয়ে ছুটলাম আবার আর আহমেদে। আর উপায় নেই।

স্কেলিং হলো, দাঁতের ব্যথা ভাবও গেল, এবার দাঁত তোলা। 

অবশেষে বহু কাঙ্খিত সেই দিনটা এল, এতো এতো বছর পর। দাঁত তুলতে বসে গেলাম। কিন্তু ভেঙে গেল। গোড়া নাকি মূল দাঁতের সঙ্গে ইন্ট্যাক্ট হয়ে আছে। দেখা যাক, সবে তো দিন দশ হলো।

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *