তবু মনে রেখো // ৩ // সুব্রত মজুমদার

5635

ভালো না লাগলেও ভূবন চাদরটা গায়ে জড়িয়ে নেয়। ইদানিং ভূবন যেন একটু একটু করে সীমার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ছে। ট্রেনের আওয়াজ মৃদু হতে মৃদুতর হতে থাকে। ভূবনের শরীরটা আস্তে আস্তে ভারি হয়ে যেতে থাকে। ভূবন চোখ খোলে। 

-“দেখুন মিঃ মৈত্র, আমাদের জুনিয়র ডাক্তাররা বিশেষ দাবিতে হরতাল ডেকেছেন। আপনাকে আমি অনুরোধ করব অন্য কোথাও অ্যাডমিট করতে। আপনাকে কোন সাহায্য করতে না পেরে দুঃখিত।” অ্যাটেনডেন্ট অসহায়ের মতো বলে। 

-“প্লিজ ম্যাম…একটু.. একটু হেল্প করুন। ” শঙ্কুদেব মুষড়ে পড়েন। 

আবার চিন্তার জালে জড়িয়ে পড়েন ভূবনবাবু। সীমার উচ্ছ্বলতা দেখেছিল সমুদ্র সৈকতে। দু’হাত দু’ পাশে ছড়িয়ে দিয়ে সমুদ্রের সফেণ ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,” সমুদ্র, আই লাভ ইউ.. আই লাভ ইউ…. আই লাভ ইউ…. “।  ভূবনের কানে কেবলই ভাঁসতে লাগল আই লাভ ইউ শব্দটা। সে হারিয়ে গেল কল্পনার রংবে রঙের দুনিয়াতে যেখানে কেউ নেই কেবল সীমা আর সীমা। 

             ‘মেঘালোকে ভবতি সুখিনোহপ্যন্যথাবৃত্তি চে                               কন্ঠাশ্লেষপ্রণয়িনী জনে কিং পুনর্দূরসংস্থে।। 

                              – মেঘদূতম্, পূর্বমেঘ, কালিদাস ।

                                       কোণার্কের সূর্য্যমন্দির দেখতে বেরিয়েছিল তারা। অপরাহ্নের আলো এসে লেগেছে মন্দিরের উপর। মাথার উপরে সাদা মেঘের ভেলা কালিদাসের কল্পনার মেঘের মতোই। যেন কোন মদমত্ত যুবকহাতি বপ্রক্রিড়ায় নিমগ্ন। আর এই সময় মন কেমন আনমনা হয়ে যায়। ভূবন বার বার সীমাকেই দেখছিল । আর সীমাও দেখছিল ভূবনকে ।

– সীমা, অনেকদিন ধরে তোমাকে একটা কথা বলব বলব বলে ভাবছি। জানি না তুমি কি ভাববে। আর আমার মতো দীন হীন একটা ছেলের তোমাকে এসব বলা ঠিক কিনা।

– মনের কথা মনে লুকিয়ে রাখলে নিজের কাছে ঠকে যাবে হাঁদারাম। বলে ফেল। আমিও বলব বলব করে বলতে পারিনি যে কথা আজ তোমাকে বলব। 

– সীমা, আমি.. আ.. আ.. আমি…. 

-কি আমি ? এত ভীরু তুমি ! বলতে পারো না – – সীমা আমি তোমাকে ভালবাসি। 

-হ্যাঁ সীমা, আমি তোমাকে ভালবাসি। খুব.. খুউব ভালবাসি। 

দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে। পাশাপাশি টুরিস্টেদের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে তারা। এক হিন্দিভাষী উড়িয়া গাইড তো বলেই ফেললেন, ” ইয়ে সব আজকালকা লেড়কা বহৎ…. চালিয়ে বাবুলোগ উস ধারপে চলিয়ে।” 

দুনিয়ার যেই যা বলুক না আজ সীমা আর ভূবনের কিছুতেই কিছু এসে যায় না। জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ পেয়েছে তারা। এই ভালবাসার জন্য লাইলা-মজনু, সিরিন-ফরহাদ, রামী-চণ্ডীদাস – – এরা উপেক্ষা করেছেন নিজেদের মান সম্মান সুখ বৈভব সমস্তকিছু। অস্তরবির লাল ছটায় কোণার্কের মিথুনমূর্তিগুলি যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। হাজার বছর ধরে শত শত প্রেম আর বিরহের দলিল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। এ যেন জৈবিক কোন মিলন নয়, এ মিলন শাশ্বত অজর অমর অক্ষয়। 

পৃথিবীর সেই আদিম কালে যখন সেই আদি মিথুন স্বর্গভ্রষ্ট হয়েছিল জ্ঞানের সন্ধানে সেদিনই জয় হয়েছিল মানব মননের। প্রমিথিউস বল আর লুসিফারই বল আর নচিকেতাই বল তাদের ত্যাগেই জ্বলেছিল প্রথম হোমানল। শাস্ত্রে তাই এই রসকে বলা হয়েছে আদিরস। পৃথিবীর প্রথম মানবীয় জৈবরাসায়নিক অভিব্যক্তি। ঠোঁটে ঠোঁট রাখল দুজন দুজনের। একটা অপার্থিব অনুভূতিতে ভরে উঠল দুজনের শরীর। 

-“আমাকে ছেড়ে যাবে না তো কোনোদিন ?” সীমা ভূবনকে জড়িয়ে ধরে। 

-“কক্ষনো না। তোমাকে যেদিন ভুলে যাবো সেদিন যেন নিজেকেই ভুলে যাই।” ভূবন সীমার চোখে চোখ রেখে উত্তর দেয়। 

– আমার বড় ভয় করে। জীবনে এত সুখ তো কোনোদিন পাইনি। এ সুখ কি আমার ভাগ্যে সইবে ? 

– যতদিন আমি আছি তোমার পাশে আছি কোন দুঃখ তোমাকে ছুঁতে পারবে না। এটা কথার কথা নয় এটা আমার অঙ্গীকার। 

দুজনে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে। এমনসময় মন্দিরের সামনের দিক হতে একটা ব্যাকুল কণ্ঠ ভেঁসে এল, “সীমা.. সীমা… ভূবন… এরা কোথায় যে যায় !!” সীমার মা এদিকেই আসছে। দুজনে নিজেদের সামলে নেয়। 

                        এরপর সময় গড়িয়ে চলে। সময়ের চাকা সুখানি দুখানিচ করে এগিয়ে নিয়ে চলে দুজনার জীবনকে। সীমা ভর্তি হয়েছে শহরের অভিজাত কলেজে। অবশ্যই টাকা আর প্রভাব প্রতিপত্তির জোরে। আর ভূবন, – – সেও একই কলেজে পড়ে। 

কলেজের প্রিন্সিপাল উদ্দালক বসু হলেন ভূবনের বাবা কালিময় ঠাকুরের যজমান। ভূবনের মেধা দেখে কালিময় ঠাকুরকে তিনি বললেন, “ঠাকুরমশাই, ভূবনকে আমার কলেজে ভর্তি করে দেন। ওর প্রতিভা আছে। জীবনে ও অনেক উন্নতি করবে দেখবেন।” 

-“গরীবের ছেলে। খুদকুঁড়ো খাইয়ে মানুষ করেছি। উচ্চশিক্ষিত যে করব তার সামর্থ্য আমার কোথায় বলুন।” ঠাকুরমশাই দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। 

– আজ থেকে আপনার ছেলে আমার। আপনি না করবেন না। আপনার ছেলের পড়াশুনা থেকে ক্যারিয়ার সমস্ত দায়িত্ব আমি নিলাম। 

       সেদিন হতে উদ্দালক বসু হলেন ভূবনের মেন্টর। ভূবন মৈত্র ভর্তি হল কলেজে। প্রথম প্রথম খুব একা লাগত ভূবনের। সীমার কলেজে ভর্তি হতে এখনো একটা বছর। তাও কোথায় ভর্তি হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বড় খারাপ লাগে ভূবনের। 

এই একাকীত্ব অবশ্য বেশিদিন রইল না। মাস তিনেক পরে দিল্লি হতে এল উদ্দালক বাবুর একমাত্র মেয়ে কেকা। কেকা এতদিন মামার বাড়িতে ছিল। মামা কেন্দ্রীয় সরকারের বড় অফিসার। হঠাৎ করে ট্রান্সফার অর্ডার আসায় খুব বিপদে পড়েছেন তিনি । তাই কর্ণাটকে যাবার আগে কেকাকে তার বাবার হেফাজতে পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েছেন তিনি। 

কেকা এসে ভর্তি হল তার বাবার কলেজে। ভূবনের উপর ভার পড়ল কেকাকে কলেজ সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসার। আর এই সূত্রে কেকার সঙ্গে ভূবনের অন্তরঙ্গতা বাড়তে লাগল। কেকার বাবা মাও তাই চাইতেন। জামাই হিসাবে ভূবনকে তাদের খুব পছন্দ। 

-” জানো গিন্নী, ছেলেটা কিন্তু খুব বুদ্ধিমান। আর ঠাকুরমশাইকে আমি অনেকদিন হতে চিনি। উনার মতো সদাশয় লোকের ছেলে….. ভাবতে পারছ..” উদ্দালকবাবু মাছের মাথাতে কামড় বসাতে বসাতে বলেন। 

-“কিন্তু ঠাকুরমশাই মানবেন ! আমরা কায়েত আর উনারা বামুন ।”  কেকার মা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

      ……. চলবে 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *