শেকড়ের স্মৃতি // বড়বেলা – ১ // বন্য মাধব 

2152

ঠিক কবে থেকে হাগারোগে ধরলো মনে নেই। একটা সময় কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগছি বলে ছাগলের কাঁচা এক কাপ দুধে শামলাফুল বাটা মিশিয়ে খেয়েছি। জীবনে প্রথমবার ভোট ডিউটি করার পরও হাগা আটকে গেছিল। অনেক কিছু টোটকা খাবারে সে যাত্রা রক্ষা হলো।

আর শেষবার মারাত্মক পথ দুর্ঘটনায় হাগা বেশ কিছু দিন বন্ধ ছিল। তখন বিছানা থেকে ওঠা তো দূরস্থান, পাশ ফিরতেও পারতাম না। শুয়ে শুয়ে ঐ অবস্থায় কম্ম সারা! ঐ অবস্থায় পড়ে ছিলাম সারা দুপুর! ডিউটি সেরে ডাক্তারদা এল। খুঁজে খুঁজে এ্যাটেডেন্টকে বার করে দু’জনে পেশাদারি কসরতে আমাকে হাগা মুক্ত করল। বাপ রে!!

আমি লক্ষ্য করেছি, এ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনের পরপরই আমার যখন তখন পেট কামড়ানোর রোগটা ধরে। এর উল্টোটাও আছে। মারাত্মক বাইক দুর্ঘটনার পর আমার এবেলা ওবেলার অ্যাসিডিটি এক্কেবারে উড়ে গেল। তবে হাগারোগটাও গেলে ভালো হতো। যাইহোক, একদিন পড়াতে যাব বলে ঘর থেকে বেরিয়েছি। আধঘন্টার হাঁটাপথ।

মাঝপথে পেট কামড়াতে শুরু করলো। তাড়াতাড়ি রেললাইনের দিকে হাঁটা দিলাম। আমাশার মোচড় কি জিনিস যার না হয়েছে কোনদিনও, তাকে বোঝানো যাবে না। কোনক্রমে একটা আড়াল দেখে শান্তির খোঁজে বসে পড়লাম। কি কপাল, পাঁচমিনিটেই সব অশান্তিকে বার করে ফেললাম। বার করেই তবে না পরম শান্তিতে পড়াতে গেলাম!

ঘটনার শেষ তো নেই। এর কিছুদিন পর কলেজে যেতে গিয়ে তার পাল্লায় পড়লাম। শিয়ালদায় নামার পরই জানান দিল, আমি এসে গেছি। ভাল, নিজেকে বললাম, ঐ তো রে তোর বঙ্গবাসী কলেজ, পা চালিয়ে ভাই! আর পা চালানো, পথ আর শেষ হয় না! তড়িঘড়ি কোনদিকে না থাকিয়ে কলেজের নোংরা টাট্টুখানায়।

কিছুটা সম্বিৎ ফেরার পর দেখলাম ট্যাপ থেকে জল পড়ছে না। হায়, কি করি! যে দেখে দেখুক ঐ অবস্থায় বেরিয়ে জলওয়ালা টাট্টুখানায় এলাম। কাজ সেরে বেরিয়ে আরেক বিপত্তি! আরে তোরা এখানে? ইংরেজি অনার্সের বড়ো জুলপিওয়ালা বাংলার মেয়েটাকে আচ্ছাসে ধরে জাপ্টাজাপ্টি করছে যে! ছো, আর জায়গা পেলো না !

হাগার নাম বাঘা, এটা আমাকে প্রায়ই অনুভব করতে হয়। এক বর্ষার সময় ঘুটিয়ারিশরীফে সকাল বেলা পড়াতে গেছি রোজকার মতই। পড়িয়ে ফিরছি, নির্দিষ্ট ট্রেনেও উঠেছি, তিনিও উঠেছেন। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বেগ আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এই বেরোয় তো সেই বেরোয়! পিয়ালিতে গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে মার লাফ, ভিজতে ভিজতে লাগোয়া শিরীষ গাছতলায়। হুঁ, ঠিক ধরেছি, মিনিট দু’তিনেকের মধ্যে শান্তি খুঁজে উঠে পড়লাম ট্রেনে। ভাগ্যিস বৃষ্টিটা হচ্ছিল! 

ঘটনার শেষ নেই। ট্রেন থেকে নেমে বাজারটা ছাড়াতে না ছাড়াতেই কতদিন যে তিনি পথ আটকেছেন কহ তব্য নয়। নিজেকে পুরুষ মানুষের অযোগ্য বলে কত যে দূরছাই করেছি! কিন্তু তিনি কোন কিছুতেই আমার সঙ্গ ছাড়বেন না। অগত্যা…..

অগত্যা তার খপ্পরে বারবার পড়ি। একবার অফিস ফেরত চংসরে যেমন পড়াতে যাই, যাচ্ছি। বাস ছাড়লো আর তিনি জানান দিলেন, সঙ্গে আছি। এই সেরেছে! কোনক্রমে ব্যাটাকে তেমাথা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেলাম। আর পারা গেল না। বাস থেকে নেমে দে দৌড়। কয়েকটা দোকান ছাড়িয়ে একটা গলির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। দোকানের শেষে পুকুরপাড়, ওধারে বাড়ি। সামনে ধানক্ষেত। এদিক ওদিক শেষবারের মতো তাকিয়ে ক্ষেতের আলে শান্তি খুঁজে পেলাম। লজ্জা, কি লজ্জা!

(চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: