তবু মনে রেখো //  ৫   // সুব্রত মজুমদার

 

-” না কেকা তোমরা কথা বল। আমার কাজ আছে। আমি আসি। বাই। ” তিমির চলে যায়।

সেদিন আর সারারাত ঘুমোতে পারে না ভূবন। এ কোন পথে চলেছে সে। এ পথের শেষ কোথায় ? আর সে পারছে না নিজের সাথে যুদ্ধ করতে। একদিকে সীমা আর একদিকে কেকা। দুজনের একজনকে বেছে নিতেই হবে তাকে। কিন্তু কাকে ?

সীমা তার ভালবাসা। আজও চোখ বুজলেই সীমাকেই দেখতে পায় সে। সীমাকে কি সে ছেড়ে থাকতে পারবে ? অসম্ভব। হৃদয়ের সমস্ত শিরাউপশিরা যেদিন শরীরে রক্তবহন বন্ধ করে দেবে সেদিনও তার শেষ সচল রক্তকণায় উচ্চারিত হবে সীমার নাম।

আর কেকা। সে তো জানেই না সীমার কথা। কেকার সমস্ত মনপ্রাণজুড়ে তো শুধুই ভূবন। তাকে ফাঁকি দিতে তো ভূবন পারে না। কেকা খুবই আবেগপ্রবণ আর রাগী। কিন্তু ওর মতো ভালো মনের মেয়ে আর হয়না। কেকার স্পর্শ ভূবনকে পাগল করে দেয়। সীমার মধ্যে ভালবাসা আছে কিন্তু নেই উদ্দামতা। সাধারণ কেজো কথাতে যাকে ‘হট’ বলা হয় সেই শব্দের ধারেকাছে সীমা যায় না। অবশ্য একটা গ্রামের বিকচকুসুম আর শহরের রঙকরা চন্দ্রমল্লিকার তুলনা করা চলে না। একটি প্রকৃতির অকৃপন হাতে গড়া আর অন্যটি সভ্যতার রসায়নে পরিবেশিত।

সামনেই কলেজের পিকনিক। অনেক তর্কবিতর্কের পর স্হির হল শান্তিনিকেতন। হ্যাঁ, কবিগুরুর শান্তিনিকেতন। কেকা প্ল্যান করেই নিয়েছে। ভূবনের জড়তাকে সে ভাঙবে। যে করেই হোক। খোয়াইয়ে বসে দুজনে হারিয়ে যাবে স্বপ্নের রাজ্যে। ভূবনের বুকে মাথা রেখে বলবে, “ভূবন আই লাভ ইউ” ।তারপর তারা হারিয়ে যাবে কৃষ্ণচূড়া সোনাঝুরি আর শালের গহীন অরণ্যে। 

সকাল সকাল ওরা ট্রেন হতে নামল। ওরা বলতে ভূবন, কেকা, তিমির, সুদেষ্ণা আর মধুরা । কলেজের ট্যুর ক্যানসেল হওয়াতে কেকার মনটা ভালো ছিল না। যার সঙ্গে কথা বলত তার সঙ্গেই ঝগড়া। বিপদ বুঝে তিমিরই প্রস্তাবটা দেয়। 

– কলেজের ট্যুর হল আর না হল তাতে কি। চল না আমরাই একটা ছোটোখাটো ট্যুরের আয়োজন করি। 

-“কিন্তু যদি যেতেই হয় তবে শান্তিনিকেতন। অন্য কোথাও নয়। রাজি ?” কেকার চোখমুখ এক অনাবিল আনন্দে ভরে ওঠে । 

-“ওকে বস ! আমি রাজি। কিন্তু ভূবন ?” তিমির ভূবনের দিকে তাকায়। 

-“রাজি। শান্তিনিকেতন খুব ভালো জায়গা। আমি গিয়েছি। বিশ্বভারতী, আমারকুটির, সোনাঝুরি, খোয়াই আরো কত কি আছে দেখার। ” ভূবনও খুশি হয়ে ওঠে প্রস্তাবে। অনেকদিন পর কোথাও যাবার সূযোগ হয়েছে। কলেজের চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন – – হাঁপিয়ে উঠেছে সে। এবার একটু খোলা হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যাবে। 

-” আমি হোটেল বুকিং করে রাখছি। রিজার্ভেশন সেটার দায়িত্বও আমি নিলাম। তোমরা কেবল গোছগাছ করে নাও ব্যাস।” তিমির তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে। 

-“তাহলে ঐ কথাই রইল। আমরা সামনের শনিবার রওনা হচ্ছি।” কেকা তিমিরকে আরেকবার সজাগ করে দেয়। 

তিমির ব্যবস্থা করেছে খাঁসা। একটা কটেজ, – জঙ্গলের ঠিক মাঝখানটাতে। একটা সরু মোড়াম রাস্তা জঙ্গল ভেদকরে বেরিয়ে গেছে। জঙ্গলের একপাশে মোড়াম মাটির ক্ষয়ে তৈরি হয়েছে প্রকৃতির এক অপরূপ সৌন্দর্য্য – – খোয়াই। এই জঙ্গলের লাগোয়া বল্লভপুর অভয়ারণ্য। অভয়ারণ্যটিতে অনেক হরিণ আছে। কেকা একপাল হরিণকে তাড়াকরে ধরার চেষ্টা করেছিল। তার ছেলেমানুষিতে সবাই হেঁসে উঠেছিল। 

-“চকিতা হরিণীর মতো হলেও হরিণের সঙ্গে দৌড়ে…. মাই ইয়াং লেডি… তুমি এখনো সমকক্ষ নো।” তিমিরের কথায় সবাই হেঁসে উঠল। কেকার মুখটা লাজে রাঙা হয়ে উঠল। 

-“কি ব্যাপার ভূবন তুমি কিছু বল। সেই যে বলেছিলে নায়িকার বর্ণনা।” তিমির ভূবনের পিঠে হাত রাখে। 

-“সে তো কালিদাসের মেঘদূতে। বিরহী যক্ষের দয়িতা বর্ণনা। ”  ভূবন বলে ওঠে। এরপর ভূবন আবৃত্তি করতে থাকে মন্দাক্রান্তা ছন্দে সেই অসাধারণ লাইনগুলো। 

তণ্বীশ্যামা শিখরিদশনা পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী 

  মধ্যে ক্ষামা চকিতহরিণীপ্রেক্ষণা নিম্নণাভিঃ।

শ্রোণীভারাদলসগমনা স্তোকনম্রা স্তণাভ্যাং

     যা তত্র সাদ্যুবতিবিষয়ে সৃষ্টিরাদ্যেব ধাতুঃ।। 

-“খুব সুন্দর। কিন্তু মানেটা কি ?”  সুদেষ্ণা কৌতুহল প্রকাশ করে। 

-” বলছি প্রিয়ে বলছি” তিমির সুদেষ্ণাকে কাছে টেনে নেয়। ” আমার মতো কোনো এক বিরহী যক্ষের মুখে তোমার মতো বাপ মায়ের স্যরি দাদার কড়া শাসনে থাকা যক্ষিনীর রুপবর্ণনা। হে প্রিয়ে তুমি যৌবনবতী – উদ্ভিন্নযৌবণা। তীক্ষ্ণ দাঁতের পাটি আর বিম্বফলের মতো রাঙা ফোলাফোলা ঠোঁট তোমার। ক্ষীণকটি সুমধ্যমা চকিতহরিণীর মতো চঞ্চল। গভীর নাভিদেশ আর ভারাক্রান্ত হয়ে নিম্নমুখী কূচযুগ তোমার। শ্রোণীভারে মদালসা হে যুবতী তুমিই স্রষ্টার সর্বোৎকৃষ্ট সৃষ্টি। “

-” সত্যি কোনো প্রেমিকাকে পটাতে এর চেয়ে ভালো বিশেষণ আর হয় না। ” কেকা কৃষ্ণচূড়ার গাছে হেলান দিয়ে হাত বাড়িয়ে ভূবনকে ডাকে। ভূবনও মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে যেতে থাকে কেকার দিকে। ওদিকে তিমির আর সুদেষ্ণা গান ধরে। কেকা  আর ভূবনও গলা মেলায়। 

উড়িয়ে দিলাম তোমার খোলা হাওয়াতে আমার ফাগুন বেলার গান 

উড়িয়ে দিলাম তোমার রাঙা ধূলোতে আমার বাঁধনহারা প্রাণ। 

তোমার বাউল গ্রামের পথে কি সুর তোলে একতারাতে 

আমের বোলে ভ্রমর মাতে আলোয় করে স্নান। 

কৃষ্ণচূড়ার ডালে ডালে দখিনাবায় বয় লহর তুলে, 

আমার হৃদয় রাঙিয়ে দিলে রাঙালে মোর প্রাণ। 

আজ পলাশের রঙের নেশায় প্রজাপতির ঘুম টুটে যায়, 

আজ ফাগুয়ায় রঙ্গিন হল মলিন যত প্রাণ।। 

      প্রকৃতিও আজ সব কৃপণতা ঝেড়ে ফেলে নবরূপে সেজে উঠেছে। শালের কচি পাতায় ভরে উঠেছে শালের বন। পলাশের বনেও লেগেছে আগুন। ন্যাড়া শিমূল গাছটাও আজ যুবতী। সারা শাখা প্রশাখা জুড়ে আগুনরঙা কিংশুকের মেলা।  আমের ছায়াঘন শাখায় বসে বসে কোকিল ডাকছে । আর কিছুদিন পরেই মহুলের কুঁড়ি ফুটে উঠবে। নবযৌবনা রাঢ়বঙ্গের মাটি রসসিক্ত হয়ে উঠবে মহুয়ার মাদকতা ভরা রসে।

 ….. চলবে 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: