তবু মনে রেখো // ৬  // সুব্রত মজুমদার

 

সন্ধ্যাবেলায় ওরা গেল আদিবাসী পল্লীতে। সেখানে রুখা মাঠে জড়ো হয়েছে সাঁওতাল সাঁওতালনির দল। সাদা শাড়ি আর বাসন্তী দোপাট্টা গায়ে দিয়ে সারবদ্ধ হয়ে  সাঁওতাল মেয়েরা নাচছে। তাদের মাথায় হাঁসের পালক গোঁজা, কবরীতে গাঁদার ফুল। হাতে হাত দিয়ে ক্যাম্পফায়ার ঘিরে নাচছে তারা। বাহা সিরিং, – – ফুলের গান।

“… টাটা বাজার কামি কুড়ি…..”

মেয়েদের সামনে দু’তিনজন পুরুষ বাসন্তী কাপড় পরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। তাদের কারোর কাঁধে মাদল তো কারোর কাঁধে নাগাড়া। তালে তাল রেখে বাজাচ্ছে তারা। তিমির এই ফাঁকে কিছুটা মহুলের মদ নিয়ে আসে।

-” আমি কোনোদিন ওসব ছুইনি।” ভূবন খেতে অস্বীকার করে।

-” জীবন তো এই ক’ ঘন্টার বন্ধু। তাই কি হবে ওসব হিপোক্র্যাসিতে ! পান কর পান কর।।” তিমির উৎসাহ দেয়।

-“জাস্ট এনজয় ভূবন। দেখ না কেমন মাদকতায় ভরে গেছে পরিবেশটা। তাছাড়া মহুলের খাঁটি নির্যাস এটা। মদ নয় বন্ধু……. মদ নয়। ” কেকার গলা জড়িয়ে আসতে থাকে। কেকার মাথাটা লুটিয়ে পড়ে ভূবনের কোলে।

কেকা ভূবনকে টেনে নিয়ে চলে ক্যাম্পফায়ারের কাছে। সাঁওতাল মেয়েদের নাচ থেমে যায়। কেকা নাচতে থাকে। তিমির একটা আড়বাঁশি এনে দেয় ভূবনকে। ভূবনের বাঁশির তালে তালে কেকা নাচে আর তার সঙ্গে পা মেলায় সুদেষ্ণা। তিমির ধরে সুর।

নাগর আমার বড় ভালো ছিল লো নাগর আমার বড় ভালো ছিল।

ওই মুখপুড়িটার পোড়া মুখে ক্যামনে মজে গেল।

নাগর আমার বড় ভালো ছিল।

আমি বেঁধেছি চুল কুরচি ফুলে নাগর আমায় হেরবে বলে

কোন সে কানা ছিঁচকে চোরে আমার ঘুঙুর খুলে লিল।

নাগর আমার চিকন কালা তারে দিব গলার মালা,

মহুল খেয়ে মাতাল হয়ে মালা খুলে লিল ।

একপাশে মাতাল মাদলের তাল উঠছে

ধাতিন তা ধাতিন তা টাটকা ধাতিন ধাতিন তা তাতাক ধাতিন ধাতিন তা।

সবাই মদমত্ত। আগুনের শিখা কেঁপে কেঁপে উঠছে। এ যে কি নৈসর্গিক দৃশ্য তা যে দেখেনি তাকে বোঝানো মুস্কিল।

      রাত্রে যে কতক্ষণ নাচগান চলেছিল তা কেউই জানে না। একসময় নিভূনিভূ ক্যাম্পফায়ারের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছিল তারা। সকালে উঠেই ভূবন দেখে তার বুকে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমোচ্ছে কেকা। একবার ইচ্ছা হল মাথাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে উঠে যায় কিন্তু পারলনা।

এমনসময় কেকা আরো নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরল ভূবনকে। ভূবনও জড়িয়ে ধরল কেকাকে। কেকা ঘুম ভেঙ্গেই ভূবনের ঠোঁটে ঠোঁট রাখল। আর সেই মিলনের সাক্ষী রইল সকালের সূর্য্য আর নাম না জানা গাছগুলো। একটা পাখি কি যেন ডাকতে ডাকতে উড়ে গেল। অনেকটা যেন – – ‘ও তোমার কে হয়… ও তোমার কে হয়….’। কেকা মুচকি হেঁসে বলল, “ও আমার…. বর হয়।”

-“ভূবন আমাকে তুমি কখনো ভূলে যাবে না তো।”  কেকার কথায় চমকে ওঠে ভূবন। এ কথাগুলো তো তার চেনা। সীমা,…. হ্যাঁ সীমা বলেছিল তাকে। কোণার্কের হাজারো মিথুনের মাঝে তারা হয়ে উঠেছিল আদিকবির সেই ক্রৌঞ্চমিথুন। তবে কি তাদেরও প্রেম…..। না আর ভাবতে পারছে না।

                                            – – পাঁচ – –

                 ভূবনের কলেজেই ভর্তি হল সীমা। সীমাকে আজ আর কোন গ্রাম্য বালিকা লাগছে না। সে এখন রীতিমত শহুরে কেতাদুরস্ত মেয়ে। পরনে একটা সুন্দর লেহেঙ্গা জাতীয় পোষাক। এত অ্যাট্রাকটিভ লাগছে যে ভূবন চোখ ফেরাতে পারলো না। রকমসকম দেখে কেকা ভূবনের মুখের সামনে দু’দুবার চুটকি বাজাল। ভূবন চমকে উঠেই ধাতস্থ হবার চেষ্টা করতে লাগল।

-“কি ব্যাপার ! কি দেখছ অমন করে ! লক্ষন তো ভালো নয়। চোখ গেলে দেব বলছি।” কেকা বাঘিনীর মতো হুঙ্কার দিয়ে ওঠে।

– না না, তা নয়। আমি আসলে…

– আসল নকল বুঝি না। তোমরা ছেলেরা যে কতটা বেবফা তা আমি জানি গুরু।

ভূবন আর কোনরকম তর্কের মধ্যে গেল না। কারন কেকার সন্দেহ মিথ্যা নয়। আর কেকাকেও কিভাবে বলবে সে সীমার কথা ! ভূবন একটা জটিল গোলকধাঁধায় পড়ে যায়। এখান হতে বেরোবার রাস্তা একমাত্র উপরওয়ালাই বাতলে দিতে পারেন।

সীমাও ভর্তি হওয়া ইস্তক খুঁজে বেড়াচ্ছে ভূবনকে। ভূবনের ঠিকানা সে জানে না। কিন্তু ভূবন যে এই কলেজেই পড়ে সে খবর সীমার কাছে ছিল। সীমা অনেক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভূবনের তরফ হতে কোনো সাহায্য সে পায়  নি। ভূবনের মনের মধ্যে যে ঝড় বইছে তা জানা সীমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেকাকে এড়িয়ে সীমার সাথে সম্পর্ক রাখা যেমন ভূবনের কাছে অসম্ভব, ঠিক তেমনি অসম্ভব সীমাকে মন থেকে মুছে ফেলা।

       সীমার একটা নতুন বান্ধবী হয়েছে। সুদেষ্ণা। সীমা সুদেষ্ণাকে তার সব কথা খুলে বলেছে। সে বলেছে তার এক বন্ধুর কথা। না ঠিক বন্ধু নয় বন্ধুর থেকেও অনেক অনেক বেশি।

-” হুমম ! জটিল কেস দেখছি। তা সেই মহানুভব থাকেন কোথায় ? খবর কিছু জান তার ?”  সুদেষ্ণা সীমার কোলের উপর হাতটা রাখে।

-” না গো, ঠিক জানি না।” সীমা হতাশ হয়ে উত্তর দেয়।

– এখন খুঁজবে কিভাবে ? কিছু তো ক্লু দরকার।

– আমি যেটুকু জানি তাতে ও এই কলেজেই পড়ে। নাম ভূবন।

– ওয়েট ওয়েট ! ভূবন । আমি অন্তত গোটা চারেক ভূবনকে চিনি যারা এই কলেজে পড়ে। তার মধ্যে দু’জন আমার খুবই পরিচিত। তোমার ভূবনকে খুঁজে বেরকরার দায়িত্ব আমার।

                    সকালে একটা রেফারেন্স বইয়ের খোঁজে বেরিয়েছিল সীমা। বই কিনে বেরোবার সময় পাশের শপিংমলটার দিকে নজর যায় সীমার। ওই তো শপিংমল থেকে বেরিয়ে আসছে,…… কে ও ! না ভূবনই তো। সীমা এগিয়ে যায়। ভূবনের সামনাসামনি এসে ডাকে, “ভূবন…”।

 ভূবন অতি পরিচিত গলায় নিজের নাম শুনে চমকে ওঠে। দেখে সামনে দাঁড়িয়ে সীমা।

– সীমা ! তুমি এখানে !

…. চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: