তবু মনে রেখো //  ৭   // সুব্রত মজুমদার

213

– “অবাক হলে ? অবাক হওয়ারই কথা। একদিনও তো খোঁজ নাওনি।”  সীমা অভিমানের সঙ্গে বলে ওঠে।

-পরের ঘরে থাকি, সবসময় সব স্বাধীনতা কি আমার আছে ?

– ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব। তুমি এতদিন চাওনি তাই দেখা হয়নি।

সীমার কথার উত্তর দেবার আর অবকাশ পেল না ভূবন। পিছন হতে কাঁধে একটা পড়ল। পিছন ফিরে দেখল কেকা।

-” কি হল বাড়ি যাবে না !” কেকা ভূবনকে জিজ্ঞাসা করল। হাতের বইগুলো কেকার হাতে দিয়ে ভূবন সীমার দিকে অপরাধীর দৃষ্টিতে তাকাল, “আমি আসি সীমা। পরে দেখা হবে।”

ভূবনের ব্যবহারে সীমা যতটা না বিস্মিত হল তার চেয়েও বেশি অবাক হল কেকা। সে কিছুটা এগিয়েই ভূবনকে শুধাল, ” মেয়েটা কে ? “

– না… মানে আমার পূর্বপরিচিত। গ্রামের।

– হুমম ! তা ভালো। তোমারও যে মেয়ে বন্ধু আছে জেনে ভালো লাগলো।

– না, ঠিক তেমনটা নয়। জাস্ট পরিচিত।

                          বাড়িতে ফিরে এল সীমা। মন আজ যেমন হারানো মাণিক পাওয়ার আনন্দে ভরে উঠেছে তেমনি বিষিয়ে গেছে বিষাক্ত অভিজ্ঞতায়। ভূবন তার সাত রাজার ধন মাণিক বটে কিন্তু তা শোকেসে তালা দেওয়া। সীমা আজ শুধু দূর হতে দেখতে পারে, – ছোবার মতো সাধ্য তার নেই। যে মেয়েটির সাথে ভূবন অনায়াসে চলে গেল সীমাকে তুচ্ছ করে সেই মেয়েটি কে ? সে কি ভূবনের নতুন প্রেমিকা ?

               না না, এ কি ভাবছে সে মেয়েটি হয়তোবা ভূবনের কোন আত্মীয়া অথবা আশ্রয়দাতার সম্পর্কের কেউ। না জেনে উল্টোপাল্টা ভাবাটা ঠিক নয়। ভূবনের সাথে দেখা করা দরকার। সবকিছু জেনে নিতে হবে।

               এইভাবে দেখতে দেখতে কয়েকটা বছর পার হয়ে গেল। ভূবন, সীমা আর কেকা তিনজনেই কলেজের গণ্ডি পারকরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ভূবন আর সীমার  ভালবাসার আবার নবজীবন লাভ করেছে। কেকাকে লুকিয়ে সীমার সাথে সময় কাটায় ভূবন। কেকা অবশ্য দৃঢ় নিশ্চিত যে ভূবনের মনে যদি কেউ স্থান পেয়ে থাকে সে হল একমাত্র কেকা। দুই নৌকাতে পা’দিয়ে দিব্যি সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে ভূবন। মনে আজ আর তার কোন ভয় বা ভাবনা নেই। সমস্ত ভয়কে জয় করতে পেরেছে সে। তাই কেকার বুকে মাথা রেখে সে আজ অক্লেশে বলতে পারে, ” এ জীবন কেন সামনের যে কোন জন্মেই আমি হব একমাত্র তোমার।”

–  সত্যি বলছ, তুমি আমার !

– হ্যাঁ কেকা আমি শুধু তোমার। আর কারো না।

– মাথায় হাত রেখে বল…

– “মাথায় হাত কেন তোমার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলছি….. আমি তোমার।”   ভূবন কেকার ঠোঁটে ঠোঁট রাখে।

– এই জানো, আমরা কিন্তু বিয়ের পর পুরি যাব হানিমুনে।

-” গোয়া নয় কেন ? আমার মনে হয় গোয়াই বেস্ট।” ভূবন কেকার চুলে বিলি কাটতে থাকে।

-“না ন্যাকারাম, পুরিই বেস্ট।” কেকা খিলখিলিয়ে হাঁসে ।

      আবার এই ভূবনকেই দেখা যায় সীমার সাথে গঙ্গার ধারে বা কোন পার্কের নির্জনে। পাঠকেরা বলবেন, – আরে এ তো পুরো ডবল গেম খেলছে ভূবন । হ্যাঁ, সেটা সত্যি… তবে আংশিক। আংশিক সত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর। কাউকেই ঠকাতে চায় না ভূবন। সীমা তার প্রেম আর কেকা তার অবলম্বন। কেকাকে একসময় ভূবন মেনে নেয় নি। সীমার কথা ভেবে ভেবে রাতের পর রাত জেগে কাটিয়ে দিত। কিন্তু কথায় বলে একসঙ্গে থাকতে থাকতে কুকুর বেড়ালের উপরও মায়া পড়ে যায়, – আর কেকা তো রক্তমাংসের জ্যান্ত মানুষ।

                 এ বিষয়ে আপনাদের কাছে আরেকটি তত্ত্বও তুলে ধরতে পারতাম কিন্তু না, বিষয়টি তাহলে অন্যদিকে মোড় নেবে। যাই হোক মাস্টার্স করার পর ভূবন পিএইচডি করার সূযোগ পেল, তাও আবার নিজেরই বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটা স্টাইপেন্ডও পাচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বিয়ে করা সম্ভব নয়। আগে চাই একটা নিশ্চিত আয়ের সংস্থান।

                   সীমার বাবাও সীমার জন্য যথেষ্ট চিন্তিত। ইদানিং তার শরীর তেমন ভালো যাচ্ছে না। ব্যাবসাতেও মন্দা চলছে। চারিদিকে শুধু ঋণ আর ঘাটতি। মাথা আর কাজ করে না। সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

-” গিন্নী, ও গিন্নী !” হাঁক পাড়েন হরনাথবাবু।

-”  কি হল আবার। কত বলি জোরে চিৎকার চেঁচামেচি করো না। কে শোনে আমার কথা। দু’দুবার স্ট্রোক হয়ে গিয়েছে, – বিপিও হাই। নাও ওষুধটা খেয়ে নাও।”    ওষুধ আর জলের গ্লাসটা এগিয়ে দেন সীমার মা। হরনাথবাবু ওষুধটা মুখে নিয়ে জলের গ্লাসে চুমুক দেন।

-“তুমি না থাকলে আমার যে কি হতো গিন্নী তা ঈশ্বরই জানেন। ব্যবসার কি হাল তা তো তুমি জানো। গ্রামের বাস তুলে দিয়ে এখানে এলাম ব্যবসার হাল ধরবো বলে,…… সব শেষ।

– এত চিন্তা কর কেন ! রাধামাধব মাথার উপরে আছেন তিনিই সব দেখবেন

– না না গিন্নী, চিন্তা আমি নিজের জন্যে করি না। আমার চিন্তা সীমাকে নিয়ে। রতিকান্ত মুখার্জিকে চেন, – – ‘মুখার্জি কেমিক্যালস এর মালিক ?

-” হ্যাঁ সুতপার বর তো।”  সীমার মা স্বামীর পাশের চেয়ারটায় বসে পড়েন।

– হ্যাঁ। ওর ছেলে রণজয়ের সীমাকে খুব পছন্দ। কোন পার্টিতে নাকি পরিচয় হয়েছে। মুখার্জির ইচ্ছা তার ছেলে রণজয়ের সাথে সীমার বিয়ে দেবার। আমার তো ডুবন্ত জাহাজের দশা। তুমিই বল এখন কি করবে,….

       এমন সন্মন্ধ ভাঙবার ক্ষমতা সীমার মায়ের ছিল না। সুতপা সীমার মায়ের একসময়ের অন্তরঙ্গ বান্ধবী ছিল। কিন্তু স্বার্থপরতা আর অপরের ভালো দেখতে না পারার গুনে বন্ধুত্বের মাঝখানে ছেদ পড়ে গেল খুব সহজেই। তারপর অনেকবার দেখা সাক্ষাৎ হয়েছে বিভিন্ন পার্টি – অনুষ্ঠানে। সম্পর্ক আর জোড়া লাগেনি। আজ বিপদের দিনে সেই সুতপাই যদি উপকারে আসে তবে ক্ষতি কি।

– তুমি হ্যাঁ করে দাও। এমন সন্মন্ধ সবার ভাগ্যে জোটে না।

– কিন্তু সীমার মতামতটাও তো জরুরি।

– কিচ্ছু জরুরি নয়। জরুরি হল জীবন। রণজয়ের সাথে বিয়ে হলে রাজরাণী হয়ে থাকবে। আর জীবনের ব্যাপারে ও জানেই বা কি !

…… চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *