তবু মনে রেখো //  ৮  // সুব্রত মজুমদার

 

হরনাথবাবু আর কথা বাড়ান না। সীমার মায়ের কথায় দম আছে। সবকিছু ঠুনকো আবেগ দিয়ে বিচার করলে চলে না। জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র, এখানে সাম দাম দণ্ড ভেদ যা কিছুই দিয়ে হোক না কেন জেতাটা জরুরি। আর যে জেতে সেই সিকান্দার। 

              রাত্রে খাবার টেবিলে সীমার মা – ই কথাটা পাড়লেন। প্লেটে রুটি দিতে দিতে বললেন, ” তোমার বাবা অসুস্থ্য সেটা তুমি জানো ?” 

-” হ্যাঁ, এতে না জানার কি আছে ?” সীমা মায়ের কথায় বিরক্ত হয়। 

– শুধু জেনেই তোমার কর্তব্য শেষ হয়ে যায় ? এতটা বড় হলে বাবার ব্যবসাটাও একবার চেয়ে দেখলে না। আমাদের একটা ছেলে থাকলে এ ভাবনা ভাবতে হতো না। 

– ও ! আমি মেয়ে বলেই তোমার যত প্রব্লেম ! রাস্তা হতে একটা কানা খোঁড়া যা পাও তুলে আনো। ঝুলিয়ে দাও আমার গলায় 

– কানা খোঁড়া নয়, রাজপুত্র দেখেছেন তোমার বাবা। তোমার যাতে ভালো হয় সেটাই আমরা চাইব। তাই তুমি যে আমাদের অপদস্থ করবে না সেটা আমরা মা বাবা হিসেবে আশা রাখতে পারি। 

– তা সেই সাত সাগর পারের রাজপুত্রটা কে ? 

– রণজয়। তোমার সুতপা আন্টির ছেলে। তুমি চেন, – পার্টিতে আলাপ হয়েছে তোমার সঙ্গে ।

– ” আই অ্যাম স্যরি মা। আমার জীবনটাকে তোমাদের ব্যবসায়ীক চুক্তিপত্রে পরিণত করতে পারবো না। এ বিয়েতে আমার মত নেই।” সীমা খাবার ছেড়ে উঠে পড়ে। 

-” তোমার মতের পরোয়া আমরা করি না। খাইয়ে দাইয়ে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছি, এখন তুমি তো তোমার মতামত জাহির করবেই।” রাগে গরগর করতে থাকেন সীমার মা। 

-” দেখো মা, এসময় কি ঠিক কি বেঠিক তা ভাবার অবকাশ আমার নেই। তুমি আমাকে বাঁচাও মা। ঋণের দায়ে আমি বিকিয়ে গিয়েছি। বিয়েটা হলে তুমিও সুখে থাকবে আর আমিও শান্তিতে চোখ বুঝতে পারব। ” হরনাথবাবু হাত জোড় করে মেয়ের পায়ের কাছে বসে পড়েন। 

  সীমাও বসে পড়ে। তারপর বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। হরনাথবাবুও চোখের জল আর ধরে রাখতে পারেন না। তিনিও কাঁদতে থাকেন। 

            সীমার কাছে এখন কোনো পথ আর খোলা নেই। আত্মহত্যা করবে ? কিন্তু তাতে তো সমস্যার কোন সমাধান হবে না।  পাওনাদারদের হাত থেকে না বাঁচালে বাবার কিছু একটা যে কোনো সময় ঘটে যাবে। আর বাবাকে বাঁচানোর জন্য রণজয়কে সে যদি বিয়ে করে তবে কি হবে তাদের প্রেমের,… কি হবে ভূবনের ? ভূবনকে সে কোনোমূল্যেই হারাতে পারবে না। 

            এদিকে ভূবনের জীবনেও ঘটে গেল চরম বিপর্যয়। ছোটবেলায় মা মারা গিয়েছেন। বাবা এতদিন তাকে মায়ের যত্নে লালন পালন করেছেন। একদিনের জন্যও বুঝতে দেননি মায়ের অভাব। আজ সেই বাবা-ই চলে গেলেন না ফেরার রাজ্যে। আজ সকাল সকাল একটা টেলিফোন এসেছিল। পাশের বাড়ির প্রশান্ত কাকু ফোন করেছিলেন। 

– কে ভূবন বলছো ? 

– হ্যাঁ, আমি ভূবন। আপনি কে বলছেন ? 

– আমি প্রশান্ত কাকু বলছি বাবা। একটা খবর তোমাকে দেওয়ার ছিল। তোমার বাবা….. 

– “কি হয়েছে বাবার….?” ভূবন অজানা আতঙ্কে শিউরে ওঠে। 

– তোমার বাবা আর নেই ভূবন। আজ শেষ রাতে একটা হার্ট অ্যাটাকে…… তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাড়ি ফিরে এস। ক্রিয়াকর্ম তো তোমাকেই করতে হবে বাবা। 

– “বাবা…..”     ফোনটা হাত হতে পড়ে যায়। ডুকরে কেঁদে ওঠে ভূবন। মূহুর্তমধ্যে সামনের দৃশ্যপট আবছা হয়ে আসে ভূবনের। শেষ আশ্রয়টুকুও আর রইলো না। এই বিশ্বসংসারে ভূবন এখন একা। কেউ এসে বলবে না, ” সারাদিন শুধু বই মুখে গুঁজে বসে আছিস। সময় মতো খাওয়াদাওয়াটাতো করতে হবে। তোর মা মারা যাওয়ার সময় আমি তাকে কথা দিয়েছিলাম তোর কোনো অযত্ন হতে দেব না। এখন কোন মুখ নিয়ে তোর মায়ের ছবির সামনে দাঁড়াব বলতো।”     আজ দুজনেই ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেলেন। 

                        – – – – ছয় – – – 

                                 কালিময় মৈত্রের ক্রিয়াকর্ম  সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হল। ফিরে আসার সময় ভূবনের চোখের জল বাগ মানতে চাইলো না। আসার সময় ভ্যান-রিক্সায় বসে যতদূর চোখ যায় অনিমেষ চোখে তাকিয়ে ছিল গ্রামটার দিকে। নাড়ি ছেঁড়ার অব্যক্ত বেদনায় শিরাউপশিরা কেঁপে উঠেছিল। ‘নিয়তিঃ কেন বাধ্যতে’ – যা হবার তা তো হবেই। ভাগ্যের উপর আমাদের কারোরই হাত নেই। এখন সবকিছু ভূলে সামনে এগোতে হবে। বাবার স্বপ্নকে সাকার করতে হবে। তিনিই তো চেয়েছিলেন ভূবন অনেক অনেক বড় হোক, অনেক নাম করুক।

                            কথায় বলে বিপদ যখন আসে তখন সবদিক থেকেই আসে। পিতৃশোকে কাতর ভূবনের জন্য আরেকটা বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল। বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই ভূবন বুঝতে পারল উদ্দালকবাবু, কেকা বা কেকার মা কোনো একটা বিষয়ে যথেষ্টই উদ্বিগ্ন। উদ্দালকবাবু বাবু বা কেকার মা কে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা ভূবনের কাছে এক্তিয়ার বহির্ভূত কাজ। তাই সে সরাসরি কেকাকেই জিজ্ঞাসা করল, ” সামথিং রং ! মানে তোমাদের সকলকে এত ডিপ্রেস দেখাচ্ছে…”

কথা শেষ হল না। কেকা এসে ভূবনের বুকের উপর আছড়ে পড়ল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।

– আমাকে বাঁচাও ভূবন। তুমি দূরে সরিয়ে দিলে আমি কোথায় যাব…. কি দোষ আমার… কি.. কি….

– কিন্তু ব্যাপারটা কি তা তো বলবে। দূরে সরিয়ে দেওয়া……. এসব কি যা তা বলছ ?

-” যা তা নয়, যা তা নয়। আমি কিভাবে তোমাকে বোঝাবো !! ” কেকা আবার কাঁদতে শুরু করে।

– আমাকে সব খুলে বল। এমনিতেই আমার মনের অবস্থা ভালো নয় তুমি জানো।

– ভূবন আই অ্যাম ক্যারিং ….

– কি বলছ তুমি ! ইমপশিবল ! তুমি মিথ্যা বলছ । এ.. এ.. হতেই পারে না।

-“কি পশিবল আর কি ইমপশিবল সেটা এই রিপোর্টটাই বলবে। ”   সামনের টেবিল হতে একটা মেডিক্যাল রিপোর্ট এনে ভূবনের হাতে দেয় কেকা। খাম হতে রিপোর্টটা বের করে পড়ে ভূবন। তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। রিপোর্টটা হাত হতে পড়ে যায় ভূবনের। এই রিপোর্ট সত্যি হবার জন্যে যেসব কারণের প্রয়োজন তা যথেষ্টই ছিল। মেঝেতে বসে পড়ে ভূবন। এ কি করেছে সে….

…… চলবে 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: